নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ ফয়সাল মিঞা বলেন, ‘বুধবার রাতে থানা কাউন্সিলের সামনে ঝামেলার কথা শুইনা দেখতে গেছিলাম। গুলির শব্দ আর পুলিশের ধাওয়ানি খাইয়া ওইদিন যে ঘরে ঢুকছি আর বাইরাইছি আজকে। অফিস দিয়াও ফোন দেছেলে। মুই কইছি যাইতে পারমু না। এহন একটা ফ্রেশ হাওয়া পাইতাছি, তাই বাইরাইছি। আমরা চাই বরিশাল শান্ত থাউক।’
বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর সঙ্গে বিভাগীয় কমিশনারের বৈঠকের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মাঝে স্বস্তি নেমে এসেছে। সাধারণ মানুষও খুশি এ ধরনের বৈঠকে।
বুধবার রাতের ঘটনার পর থেকে নগরের বেশ কিছু দোকানপাট বন্ধ থাকলেও সোমবার সকালে নগরীর চকবাজার, বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক, গির্জা মহল্লা, কাঠপট্টি, বাংলাবাজার, নতুন বাজার এলাকা ঘুরে দেখা যায় আবার স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও পুরোপুরি ফিরে এসেছেন তাদের কাজে।
বাংলাবাজার এলাকার ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বুধবার রাতে সদর উপজেলা পরিষদ চত্বর অর্থাৎ আমরা যেটাকে থানা কাউন্সিল হিসেবে চিনি, সেখানে আনসারদের ছোড়া গুলিতে মেয়রসহ ৩০ জন আহত হওয়ার খবর পাই। ইউএনওর বাসভবনে হামলার সময় গুলিও ছোড়া হয়। রাতভর আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়।
‘বরিশালের রাজনীতিতে প্রভাবশালী সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর ওপর গুলি বর্ষণের খবরে সবার মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। প্রভাবশালী যত নেতা সবাইকে পিটুনি দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার আর শুক্রবার আমি নিজেই ভয়ে দোকান খুলিনি।’
নথুল্লাবাদের চা দোকানি মো. হাবিব বলেন, ‘পুরা শহরডা অচল হইয়া গেছিল। ময়লা পরিষ্কার হয় নাই অনেক দিন। রাস্তায়ই বাইরাইন্না যাইত না এই ঘটনার পর। আতঙ্ক তো ছিলই, লগে ছিল দুর্গন্ধ। পরে অবশ্য এই ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করা হইছে।
‘মোরা ছোডো মানুষ তবুও কই যে, ঝামেলা মেয়র আর বড় বড় স্যারেগো লগে। তয় হেয়ার মধ্যে মোরা পাবলিক ঝামেলার মধ্যে পড়মু কেয়া? হুনছি মিটিং হইছে মিচুয়ালে। তাড়াতাড়ি মিটমাট হওয়া ভালো। নাইলে হেরা তো আর ভোগে না, অর্ডার দেয় খালি আর ভুগি মোরা।’
নবগ্রাম রোডের বাসিন্দা সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. মামুন বলেন, ‘বৃহস্পতিবার হইতে রোববার পর্যন্ত গাড়িই বাইর করি নাই গ্যারেজ দিয়া। মালিকরে কইছি রাস্তাঘাটে গাড়ি ভাঙলে হেয়ার টাহা কিন্তু মুই দেতে পারমু না। কেমনে বাইর করমু? বরিশালের যে অবস্থা আছিল! কোনহান দিয়া কেডা এউক্কা ঢিল মারবে, আর মোর টাহা নামতে থাকবে। নিজে বাঁচলে টাহা ইনকাম করা যাইবে সমস্যা নাই।
‘তয় আইজ হইতে নামছি। হুনছি মেয়র স্যারের লগে সব ঝামেলা শেষ করছে। প্রধানমন্ত্রী নাকি বইতে কইছে হেগো। যাই হোক এইরহম পরিস্থিতি মোরা আর চাই না। এহন যদি সবাই মিল্লা হেরা কাম করতে পারে তাহলে মোরা শান্তিতে থাকমু, আর মোগো বরিশালেরও উন্নতি হইবে।’
উপজেলা পরিষদ চত্বরে বুধবার রাতে শোক দিবসের ব্যানার খোলাকে কেন্দ্র করে ইউএনও মুনিবুর রহমানের বাসভবনে হামলা হয়। এ সময় সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর আনসার সদস্যদের গুলি ছোড়ার অভিযোগ উঠেছে। সংঘর্ষ হয় পুলিশের সঙ্গেও।
উপজেলা পরিষদ চত্বরে শোক দিবসের ব্যানার খোলাকে কেন্দ্র করে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়
এতে মেয়র ও প্যানেল মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকনসহ ৩০ জন আহত হন, যদিও আওয়ামী লীগের দাবি, আহতের সংখ্যা ৭০।
এ ঘটনায় কোতোয়ালি মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ও ইউএনও মুনিবুর রহমানের করা দুই মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহকে।
মামলার মোট আসামি ৬০২ জন, তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে প্যানেল মেয়র ও সিটি করপোরেশনের রাজস্ব কর্মকর্তাও ইউএনওকে আসামি করে দুটি মামলার আবেদন করেন।
বুধবার রাতে সংঘর্ষের কথা শুনে সেখানে গিয়েছিলেন সিঅ্যান্ডবি ১ নম্বর পুল এলাকার ফয়সাল মিঞা।
তিনি বলেন, ‘বুধবার রাতে থানা কাউন্সিলের সামনে ঝামেলার কথা শুইনা দেখতে গেছিলাম। গুলির শব্দ আর পুলিশের ধাওয়ানি খাইয়া ওইদিন যে ঘরে ঢুকছি আর বাইরাইছি আজকে। অফিস দিয়াও ফোন দেছেলে। মুই কইছি যাইতে পারমু না। এহন একটা ফ্রেশ হাওয়া পাইতাছি, তাই বাইরাইছি। আমরা চাই বরিশাল শান্ত থাউক।’
বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘সমঝোতা বৈঠক রোববার রাত সোয়া ৯টায় শুরু হয়। মেয়র, প্যানেল মেয়র, বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশ কমিশনার, ডিআইজি, জেলা প্রশাসক, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাসহ অনেকে ছিলেন। বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে আমাদের অভিভাবক বরিশাল-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর কথা হয়েছে।
‘আমরা একটি সুষ্ঠু সমাধানে পৌঁছেছি। আমাদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো হয়েছে সেগুলো প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ভুল-বোঝাবুঝি উভয়পক্ষের মধ্যে ছিল। ত্রুটি আমাদেরও কম ছিল না। এর বেশি বিস্তারিত কিছু বলতে পারছি না।’
জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘সমঝোতা বৈঠকের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানি না। তবে বিষয়টির মীমাংসা হয়ে থাকলে আমরা খুব খুশি।’