নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ মহানবী হযরত মহম্মদ বলেছেন- ‘প্রত্যেক মানুষের করণীয় ৬টি বিষয় রয়েছে’। তারমধ্যে একটি হলো অসুস্থ হলে ভাই হিসেবে তার পাশে দাঁড়ানো এবং সেবা করা। মহানবীর এই অমোঘ বাণী বক্ষে ধারণ করে কেবল মুসলমানদের জন্য নয়; হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ সকলের জন্য চলমান করোনা মহামারীর সময়ে আমরা চরমোনাই ভলান্টিয়ার সার্ভিস টিম (সিভিএসটি) তৈরী করেছি। হিসেব যদি বলি গেল বছরের ৮ই মার্চ,২৪ রমজান থেকে যাত্রা শুরু করে ১১ আগস্ট’২১ পর্যন্ত এই স্বেচ্ছাসেবক টিম ১৯৬ জনের মৃত দেহ দাফন করেছে। যার মধ্যে ৩০ জন নারী রয়েছেন। এক্ষেত্রে ২৫ জন নারী সদস্য আর ২৫০ জন পুরুষ সদস্য মিলে ২৭৫ সদস্যের টিম দিনরাত অনবরত কাজ করে চলছে। করোনা রোগিদের জন্য ২০ টি অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে যাত্রা শুরু করে এখন পর্যন্ত ৫০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে এই স্বেচ্ছাসেবকদের ভান্ডারে। এই টিমে ৫টি মটরসাইকেল, ২টি এ্যাম্বুলেন্স আর ১টি সিএনজি রয়েছে রোগি থেকে মৃত দেহ বহন করার জন্য। যার পুরোটাই বিনামূল্যে। পর্যাক্রমে এই সংখ্যা এবং কার্যক্রম কেবল মহানগরীর ৩০ টিওয়ার্ড আর সদর উপজেলার ১০ ইউনিয়নে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইনা। আরো বড় পরিসরে দেশের অসহায় মানুষের জন্য কাজ করতে আগ্রহী। এমন আগ্রহের কথা আনন্দ চিত্তে প্রকাশ করলেন সিভিএসটি’র চেয়ারম্যান এবং শায়খে চরমোনাই মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম।
এই টিমের স্বেচ্ছাসেবকদের ঝুলি নানা অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। নবীন থেকে শুরু করে প্রবীন সদস্য রয়েছেন যারা সামর্থ্য অনুযায়ী সেবার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কার্পণ্যতা করেননি। করোনার শুরুর ভয়াবহতার দিকে যখন সন্তানরা মা-বাবার মৃতদেহ হাসপাতালে রেখে পালিয়ে গেছেন, স্বজনরা আসেননি কাছে, সেই সময়ে সিভিএসটি’র স্বেচ্ছাসেবকরা লাশের গোসল থেকে যানাজা শেষে দাফন পর্যন্ত করায়ে সেবার ধারা অব্যহত রেখেছেন। ক্যামন করে এমন শক্ত মানসিকতা তৈরী করেছেন বা অটুট রেখেছেন এই প্রশ্নের জবাব মেলে মাঝ বয়েসী এক স্বেচ্ছাসেবক মাওলানা আবদুল আজিজুল হকের কথায়। গেল ১১ই আগস্ট সংগঠনের প্রধান কার্যালয় নগরীর চাঁদমারীর মুজাহিদ কমপ্লেক্সে তাদের এই কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে গেলে কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, মৃত্যুতো হবেই। যখন দেখলেন, করোনায় মৃত্যু হওয়াতে লাশ হাসপাতালে রেখে স্বজনরা লাপাত্তা, তখন যেন অন্তর্যামী নিজ থেকেই শক্তির যোগান দিয়েছেন। নেমে পড়লাম কাজে। লাশ হাসপাতাল থেকে নামানো, এ্যাম্বুলেন্সে বহনকরা, গোসল করানো কখনোবা যানাজার নামাজ শেষে বাড়িতে নিয়ে দাফনের কাজ সম্পন্ন করে এসেছেন। আবদুল্লাহ আল মামুন নামে এক তরুন সদস্য তিনি নিজের দায়বদ্ধ থেকে করোনকালীন সময়ে সিভিএসটি’র এই কর্মকান্ডে সামিল হয়েছেন। তারা কেবল মুসলমানদের নয়; হিন্দু ধর্মালম্বীদের মৃতদেহ শ্মশাণে পৌঁছে দিয়েছেন। এরপর নিজ ধর্মের রীতি অনুযায়ী সৎকার হয়েছে। আর মো. আফজাল হোসেন দূরানী একাই অর্ধ শতাধিক লাশের দাফন সম্পন্ন করেছেন এযাবৎ।
গোড়ার দিকে তিনি শেরেবাংলা মেডিকেলে এসব কাজ করতে গিয়ে পরিবার থেকে আলাদা রুম নিয়ে থেকেছেন। এখন অনেকটা গাসওয়া বলতে কিছুই মনে করেন না। মধ্য রাত আর শেষ রাত নেই,অসহায় মৃতদেহ দাফনের যেন নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছেন এই আফজাল হোসেন।
গেল ৫ আগস্ট নগরীর খ্যাতনামা চিকিৎসক ক্যাপ্টেন সিরাজুল ইসলাম করেনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার লাশ বহন থেকে দাফন কার্যক্রম করেছিলেন এই সিভিএসটি’র সদস্যরা। যে কথা অকপটে স্বীকার করেন ক্যাপ্টেনের ফুপাতো ভাই এস এম জাকির হোসেন। এই স্বেচ্ছাসেবকদের নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন সত্যিই মনে ধরার মত জানালেন তিনি। এমন করেই জানালেন ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের চিকিৎসক গোলাম সরোয়ার। সপ্তাহ ধরে এই চিকিৎসকের মা এবং বাবা শেরেবাংলা মেডিকেলের করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। দু’জনকে ৫০টির উপরে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করেছেন সিভিএসটি’র সদস্যরা। তবে তার মা মারাগেছেন, তাকে রাজাপুর উপজেলার আলভি গ্রামের বাড়িতে এই টিমের নারী সদস্যদের সহায়তায় দাফন সম্পন্ন করেছেন। তবে তার বাবা আ. গফুর এখনো শেবামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। নগরীর সাগরদী এলাকার স্বামী এবং স্ত্রী দু’জনে করোনায় আক্রান্ত হলে মেয়ের ফোন পেয়ে ওই দম্পত্তিকে ১১টি সিলিন্ডার দিয়েছিলেন চরমোনাই ভলান্টিয়ার সার্ভিস টিমের সদস্যরা। জুলাই মাসের ১৭ তারিখ স্ত্রীর মৃত্যু হলে এই স্বেচ্ছাসেবক টিমের নারী সদস্যরা গোছল করানো থেকে দাফনের ব্যবস্থা পর্যন্ত করেছিলেন। সেখানের বর্তমান পরিস্থিতির কথা জানতে গিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞ মেলে। তবুও সিভিএসটি’র সদস্যরা অনুতপ্ত নন মোটেই। তাদের বক্তব্য স্ত্রীকে হারিয়ে স্বামীর মানসিক অবস্থা বিপর্যস্ত হতে পারে এটাই স্বাভাবিক। তারপরও তাদের দায়িত্ব থেকে পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন, ক্যামন আছেন পরিবারের অন্য সদস্যরা।
ঈদুল আযাহার দুই দিন আগে এবং এর পরের দিন শেরেবাংলা হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় চাহিদা বেড়েছিল। তখন সিভিএসটি’র সদস্যরা সাধ্য অনুযায়ী যোগান দিয়েছিলেন। এমনই একজন মো.আবু শাহ যিনি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা ইউনিয়ন থেকে শেরেবাংলা মেডিকেলে এসেছেন করেনায় আক্রান্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল শিক্ষিকা ভাবি রিনা বেগমকে (৪৫) নিয়ে। তিনি হটলাইন ০১৭৪৭-৪০১২১৭ নাম্বারে ফোন করে চরমোনাই ভলান্টিয়ার সার্ভিস টিম থেকে অক্সিজেন সিল্ডিার পেয়েছিলেন। এরপর পাশ গ্রামের চাচী সম্পর্কের পলি আক্তরকেও এখান থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার এনে এখন অনেকটা সুস্থ করে তুলেছেন। এরপর আবু শাহের কাছে হাসপাতালে অনেক অসহায় রোগির স্বজনরা এসেছেন যাদের হটলাইনে ফোন করে অক্সিজেন সিলিন্ডার পাইয়ে দিতে সহায়তা করেছেন। এই আবু শাহ সিভিএসটি’র স্বেচ্ছাসেবক এবং তাদের চেয়ারম্যান শায়খে চরমোনাই মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমের জন্য মন থেকে দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন।
চরমোনাই ভলান্টিয়ার সার্ভিসটিমের (সিভিএসটি) মুখ পাত্র হলেন আবদুল্লাহ আল মামুন টিটু। তার সাথে কথা হলে বলেন, তারা কেবল অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়েই ক্ষ্যান্ত নন। এর সাথে অক্সিমিটার, হ্যান্ডস্যানিটাইজার বা মাস্ক পর্যন্ত দিয়ে থাকেন।
এ্যাম্বুলেন্সযোগে রোগি আনা নেওয়া ছাড়াও দাফনের জন্য কাফনের কাপড়ও বিনামূল্যে ব্যবস্থা করেন। তাদের ১৬ লিটারের অক্সিজেন সিলিন্ডার প্রতিটি ১৩ থেকে ১৭ হাজার টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে। সিলিন্ডার রিফিল করার ক্ষেত্রে তারা কোন কার্পণ্য করেননা, পুরো ১৮০ টাকা খরচ করেন যা অন্য কোন সংস্থার চেয়ে অক্সিজেনের পরিমাণ দ্বিগুন হয়ে থাকে। এতে করে রোগিদের সুবিধা হয় বেশ। তাদের ইচ্ছে আছে এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি কেবল করোনাকালীন সময়েই নয়; সামনে আরো অনেক কাজ করার পরিকল্পনা করেছেন। তারা ইতিমধ্যে নগরী এবং উপজেলার ১০টি ওয়ার্ডে ৬৭ লাখ টাকার ত্রাণ সহায়তা দিয়েছেন। ঈদুল আযাহার দিনে পন্টুনে ছিন্নমূল শিশুদের উন্নত মানের খাবার দিয়েছেন। শেরেবাংলা হাসপাতালে রোগি এবং স্বজনদের ফিন্নি খাইয়েছেন। এখন রোগিদের সহায়তার জন্য ব্লাড ডোনার ক্লাব করবেন। তাদের ৮০ জন স্বেচ্ছায় রক্তদাতা সদস্য তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এছাড়াও শীতকালে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করার ইচ্ছা আছে।
টিমের মুখপাত্র টিটুর কথার মিল পাওয়া যায় সিভিএসটি’র চেয়ারম্যান এবং শায়খে চরমোনাই মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমের বক্তব্যে। তাদের এই সেবার কার্যক্রম বৃহৎ পরিসরে করতে চান। এনিয়ে তার ইচ্ছেটা হলো- মৃত্যু আল্লাহর হাতে, তারপরও মানুষ যাতে নূন্যতম চিকিৎসা সুবিধা পেতে পারে তা নিশ্চিত করা। তিনি মনে করেন তাদের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে পূর্ণ হবে এমন ইচ্ছা।