রিপোর্ট দেশ জনপদ ॥ বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রকোপে যেন পুরো বিশ্ব এখন থমকে আছে। প্রতিদিনই করোনায় মারা যাচ্ছে বহু মানুষ। সংক্রমণে অসুস্থের হার যেন এখন লাগামছাড়া। বাড়ছে হাসপাতালগুলোয় উপচেপড়া ভিড়। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানুষের জীবিকার সংকট। এখন সবার সামনেই যেন এসেছে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার সময়। আর ঠিক সেই মুহূর্তে মানুষের জীবন ও জীবিকার চাকা সচল রাখতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বাংলাদেশ।
তবে মহামারি দুর্যোগের এমন সময়েও সঠিক পদক্ষেপ নিতেও যেন ভুল করছে না সরকার। মানুষের জীবন ও জীবকার চাকা সচল রেখে লকডাউনে শিথিলতা আনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে খুলে দেওয়া হয়েছে দেশের দোকানপাট-শপিংমল। চলতি মাসেই খোলার কথা রয়েছে গণপরবহনও। তবে এসব বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে বেঁধে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন বিধিনিষেধ। এদিকে মহামারি করোনাকালেও থেমে নেই অপরাধের মাত্রা। জীবিকার সঙ্গে জীবনের লড়াইয়ে পিছিয়ে নেই দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরাও। প্রতিটি থানায় প্রতিদিনই হচ্ছে নতুন নতুন মামলা, ধরা পড়ছে অপরাধিরাও। করোনা মহামারিতেও মাদক ব্যবসা, ধর্ষণ ও হত্যাসহ সব ধরনের অপরাধ চলছে নির্বিকার ভাবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনোভাবেই লাগাম টেনে ধরতে পারছে না অপরাধীদের। তবে প্রতিদিনই অপরাধ দমনে চলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান।
রাজধানীতেই চলতি মাসে ৭ দিনে (১৯-২৫ তারিখ) মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ২৪০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সাধারণ ছুটি থাকলেই সীমিত পরিসরে খোলা রয়েছে আদালতও। সেখানে প্রতদিনই হচ্ছে গণসমাগম। করোনা ঝুঁকিতে রয়েছে বিচারক থেকে শুরু করে আইনজীবীরাও। এছাড়াও যেসব অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে হাজতে পাঠানো হচ্ছে তাদের কারো জন্যই রাখা হয়নি করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা। সেই ক্ষেত্রে কারাগারগুলোও রয়েছে উচ্চ ঝুঁকিতে। একদিকে দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি বন্দি রয়েছে, এরমধ্যে করোনাকালেও প্রতিদিনই সেখানে যাচ্ছে অনেক নতুন বন্দি। এ বিষয়ে দেশের অপরাধ বিশ্লেষকরাও বেশ উদ্বেক প্রকাশ করছেন। তাদের মতে দেশের কারাগারগুলোর প্রবেশপথে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা উচিত। এদিকে গতকাল থেকে বেশ কয়েকটি বিধি-নিষেধ দিয়ে খোলা হয়েছে দোকানপাট ও শপিংমল। এর আগে সরকারের প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, দোকানপাট ও শপিংমল প্রতিদিন সকাল ১০টা-বিকাল ৫টা পর্যন্ত যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন সাপেক্ষে খোলা যাবে। স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট বাজার বা সংস্থার ব্যবস্থাপনা কমিটিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেও বলা হয়।অপরদিকে গতকাল সরকারের এক প্রজ্ঞাপনে আরও এক সপ্তাহের লকডাউন রাখার নির্দেশনা জানানো হয়। দেশের অধিক মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়টি বিবেচনা করে সরকার এই নতুন এ নির্দেশনা জারি করে। জানা গেছে, চলতি মাসেই শর্ত সাপেক্ষে চালু করা হবে গণপরবহনও।
এতে করে যে সবার মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে রয়েছে উচ্চ মাত্রায় করোনার ঝুঁকিও। মার্কেট খুলে দেওয়ার প্রথম দিনে নিউমার্কেট, গাউসিয়া মার্কেট ও গুলিস্তানের বেশ কয়েকটি শপিংমল ঘুরে দেখা গেছে, বিপণিরা মার্কেটের দোকানপাট খুললেও নেই তেমন ক্রেতা। তবে কোনো মার্কেটেই দেখা যায়নি তেমন কোনো স্বাস্থ্যবিধি। মার্কেট ব্যবসায়ীরা জানান, মার্কেট খোলার প্রথম দিন দোকান গোছানো ও ধোয়ামোছা করাতেই অনেক সময় চলে গেছে। তবে দুপুরের পরও নেই কোনো ক্রেতা। দু-একজন ক্রেতা এলেও দরদাম করেই চলে যান। ব্যবসায়ীরা আরও জানিয়েছেন, তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিক্রি করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছেন। তবে মার্কেটে আগতরা স্বাস্থ্যবিধি মানার যেন কোনো তোয়াক্কাই করছেন না। তবে মনিটরিংয়ের দায়িত্বে মার্কেটগুলোতে তেমন কাউকেই দেখা যায়নি। বেশ কয়েকদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নগরীর সরক থেকে শুরু করে অলিগলি কিংবা মহল্লাতেও নেই কোনো স্বাস্থ্যবিধি তোয়াক্কা। যে যার মতো করেই চলাফেরা করেছে নির্দ্বিধায়। এদের অনেকেরই মুখে নেই মাস্ক। কারো মুখে মাস্ক থাকলে তা কিছুক্ষণ পর খুলে রাখতেও দেখা গেছে।
বিভিন্ন এলাকার বাজারগুলোতে গেলে যেন মনে হয় দেশে কোনো ধরনের করোনার প্রকোপই নেই। কারো মধ্যেই নেই করোনার ভীতি। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই মাস্ক ছাড়া বেচা-কেনা করছেন। গায়ের সঙ্গে গা ঘেঁষে চলছে অনবরত। পাইকারি আড়তগুলোর অবস্থা আরও নাজুক। সকালে যেন রাজধানীর পাইকারি আড়তগুলোতে মানুষের ভিড়ে যাওয়াই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। রাজধানীর বাজার কিংবা আড়তে কোথাও নেই কোনো স্বাস্থ্যবিধি, নেই স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতে সরকারের তরফ থেকে সংশ্লিষ্ট কেউই। তবে মাঝেমধ্যেই দেখা গেছে ব্যক্তিগত পরিবহন কিংবা রিকশা চালকদের ওপর চরাও হচ্ছে পুলিশ প্রশাসন। তবে পূর্বের মতো পুলিশে দেখা যায়নি কঠোরতা।
এদিকে দেশে স্বাস্থ্যবিধি না থাকায় করোনার প্রকোপ এখন লাগাম ছাড়া। প্রতিদিনই করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে কয়েক হাজার মানুষ। সংক্রমণ নিয়ে এ পর্যন্ত মারা গেছে ১১,০৫৩ জন। সর্বশেষ গতকালকের তথ্য অনুযায়ী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় (রবিবার) ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশে যে হারে করোনা রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে তাতে ইতোমধ্যে হাসপাতালগুলো রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। বর্তমানে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। চিকিৎসার অভাবেই মারা যাচ্ছে অনেক করোনা রোগী। হাসপাতালে সিট নেই, নার্স থাকলেও ডাক্তার নেই, ঠান্ডা জ্বরের ঔষধ থাকলেও নেই অক্সিজেন। দিনের পর দিন অপেক্ষার প্রহর গুনেও মিলছেনা আইসিইউ। করোনা হাসপাতালের ইউনিটগুলো যেন এখন আর্তনাতে ভরপুর হয়ে উঠছে। যে যার মতো করেই প্রবেশ করছে আর বের হচ্ছে। ভিতরে থাকা লোকেরাও বাইরে গিয়ে ঘুরছে নির্দ্ধিধায়। সব মিলিয়ে সব মিলিয়ে ভেঙে পড়েছে করোনার চিকিৎসাব্যবস্থা। করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ডাক্তাররা জানান, সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন তারা।
তবে রোগীর চাপ অতিমাত্রায় বেশি থাকায় হাসপাতালে রোগী রাখার ঠাঁই হচ্ছে না। তাদের চোখের সামনেই বিনা চিকিৎসায় রোগী মারা যাচ্ছে। জানা গেছে ৩৬ জেলায় এখনো পরিপূর্ণভাবে আইসিইউ চালু হয়নি। এতে করে জেলা পর্যায়ে আইসিইউয়ের অভাবেও অনেক রোগী মারা যাচ্ছেন। করোনার প্রকোপে দেশে সাধারণ ছুটি ও গণপরিবহন বন্ধ থাকায় বন্ধ হয়ে পড়েছে অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে ছিল লাখ লাখ মানুষের আয় রোজগারের স্থল। বর্তমানে অনেকেরই কর্মস্থান বন্ধ হয়ে আছে। আর এতে করে দেশের অনেক মানুষই অর্থ সংকটে পরে জীবন-জীবিকার তাগিদে অসহায় হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবারের শিশুরাও রাস্তায় নেমেছে খুধা নিবারণের জন্য কর্মের খোঁজে। অনেক শিশুকেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে মাস্ক বিক্রির কাজে নিয়োজিত থাকতে। এদের কারো বাবা কাজ করত কোনো শিল্প-কারখানায়, কারো মা বা ভাই কাজ করত অফিস পাড়ায়। অফিস পাড়াগুলো বন্ধ থাকায় তারা সবাই এখন বেকার। এসব সমস্যার কথা চিন্তা করেই সরকারের পক্ষ থেকে বারবার স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতে বিভিন্ন বিধিনিষেধ বেঁধে দিলেও কেউই মানেনি বিধি-নিষেধ। এতে করে মাঝেমধ্যেই দেখা যায় সরকারকে কঠোর হতে।
ঈদকে সামনে রেখে মানুষের জীবন-জীবিকার কথা ভেবে পুনরায় লকডাউন শিথিল করছে সরকার। এদিকে সব বাধা বিপত্তি পেরিয়েও দেশে চলছে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ। সাধারণ ছুটির মধ্যেও শ্রমিকদের কাজ করতে দেখা গেছে মেট্রোরেল প্রকল্পে। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বরেই এ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করে উদ্বোধনের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এ জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে লকডাউনেও সীমিত পরিসরে চলছে প্রকল্পের কাজ। পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। নদী শাসনের কাজের অগ্রগতি ৮৪ দশমিক ৫ ভাগ সম্পন্ন। প্রকল্পের সংযোগ সড়ক, জাজিরা সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়া-২ এর নির্মাণকাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে।
এরই মধ্যে সেতুর ওপর স্প্যান বসানোর কাজ শেষ। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের অন্যতম আরেকটি হচ্ছে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে দীর্ঘ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল। এ প্রকল্পে নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। জানা গেছে, প্রকল্পটির অগ্রগতিম প্রায় ৬৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়াও গাজীপুর থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত সাড়ে ৪ কিলোমিটার এলিভেটেড অংশ নির্মাণকাজ ও ঢাকা-এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বাস্তবায়ন কাজসহ অনেক উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে।