ঝালকাঠি
ঝালকাঠিতে ১২ শিক্ষার্থীর জন্য ১৩ শিক্ষক, এসএসসিতে পাস করলো মাত্র একজন!
জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। তাদের মধ্যে পাস করেছে মাত্র একজন। অথচ এই ১২ শিক্ষার্থীর পাঠদানের জন্য বিদ্যালয়টিতে কর্মরত রয়েছেন ১৩ জন শিক্ষক। এর বাইরে ক্লার্ক, পিয়নসহ চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রয়েছেন আরও পাঁচজন। অর্থাৎ শিক্ষক-কর্মচারী মিলিয়ে ১৮ জন জনবল থাকা বিদ্যালয়টির এমন ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার এস.জিএস. সেকেন্ডারি বিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টির শিক্ষার মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং নিয়মিত পাঠদান নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ১৩ জন শিক্ষক কর্মরত। তাঁদের পাশাপাশি পাঁচজন কর্মচারী রয়েছেন। এত জনবল থাকার পরও এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১১ জনেরই অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনায় বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, কাগজ-কলমে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক হলেও বাস্তবে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঁচ-ছয়জনের বেশি শিক্ষার্থী দেখা যায় না। শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতির পাশাপাশি শিক্ষক উপস্থিতি ও পাঠদান নিয়েও রয়েছে অভিযোগ।
সম্প্রতি বিদ্যালয়টিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ক্লাস চলাকালে কয়েকজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের মাঠে ফুটবল খেলছে। কয়েকজনকে মাঠে বসে গল্প করতেও দেখা যায়। ছাত্রীদের অধিকাংশই বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিল না। শ্রেণিকক্ষগুলোতেও নিয়মিত পাঠদানের স্বাভাবিক পরিবেশ চোখে পড়েনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় বিদ্যালয়টির ফলাফল ভালো ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে শিক্ষক সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার মান সেই অনুপাতে বাড়েনি। নির্ধারিত সময়ের আগে বিদ্যালয় ছুটি দেওয়া, শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং পাঠদান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
ফলাফলের চিত্রও একই ধরনের অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি থেকে ছয়জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে তিনজন পাস করেছিল। আর ২০২৬ সালে পরীক্ষার্থী দ্বিগুণ হলেও ফলাফল নেমে এসেছে তলানিতে—১২ জনের মধ্যে পাস করেছে মাত্র একজন।
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক রহিমা আক্তার অবশ্য শিক্ষার্থীদের খারাপ ফলাফলের জন্য বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতিকে দায়ী করেছেন।
তিনি বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ের ভবনটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে স্থানীয়রা তাঁদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে দিতে চান না। শ্রেণিকক্ষের ভেতরেও অনেক সময় আতঙ্কের মধ্যে ক্লাস নিতে হয়। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে না আসায় পড়ালেখার মান খারাপ হয়েছে এবং ফলাফলও খারাপ হয়েছে।”
তবে সরেজমিনে ক্লাস চলাকালে শিক্ষার্থীদের মাঠে খেলাধুলা করা এবং নির্ধারিত সময়ের আগে বিদ্যালয় ছুটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। উপজেলা পর্যায়ে খেলাধুলা চলায় শিক্ষার্থীরা মাঠে রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে অন্য শিক্ষার্থীদের কেন শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান করানো হচ্ছে না—এমন প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনো উত্তর দিতে পারেননি।
এ বিষয়ে ঝালকাঠির জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু ছাঈদ বলেন, “খোঁজ নিয়ে দেখব কী কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ফেল করেছে। বর্তমানে ঢাকায় আছি। পরে বিস্তারিত বলতে পারব।”
স্থানীয়দের মতে, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার দায়িত্ব যেমন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের, তেমনি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদেরও। তাঁদের প্রশ্ন, সরকারি অর্থে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া হলেও যদি শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা নিশ্চিত না হয়, তাহলে এর দায় কার?
তাঁরা বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উপস্থিতি, নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা এবং ধারাবাহিকভাবে খারাপ ফলাফলের কারণ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সমস্যা থাকলে তা দ্রুত সমাধান এবং শিক্ষা কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনারও দাবি তাঁদের।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এতে একদিকে বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রমে গতি ফিরবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তা থেকে রক্ষা পাবে।



