বরিশাল
ফেঁসে যেতে পারেন সাবেক ডিসি খায়রুল, বরিশালে মন্ত্রিপরিষদের জিজ্ঞাসাবাদ!
বরিশালের সাবেক জেলা প্রশাসক মোঃ খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। অভিযোগের বিষয়ে শুধু নথিপত্র যাচাই নয়, সরেজমিন অনুসন্ধানেও নেমেছে তদন্ত কমিটি। এরই অংশ হিসেবে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি বরিশালে এসে বর্তমান জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলে তাদের বক্তব্য গ্রহণ করেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে লিখিত, ভিডিও ও মৌখিক বয়ানও নেওয়া হয়েছে বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিন অনুসন্ধান ও তথ্য যাচাইয়ের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে ১৯টি বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথি চাওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন শাখা-২ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের পর গত ৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন শৃঙ্খলা অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ সাহেদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ০৪.০০.০০০০.০০০.৫১১.২৭.০১০৯.১৭.৪২৫ স্মারক নম্বরে দুই সদস্যের কমিটি গঠনের বিষয়টি জানানো হয়।
নথি অনুযায়ী, তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্মসচিব মো. মখলেছুর রহমানকে এবং সদস্য করা হয়েছে একই বিভাগের উপসচিব মিজ্ শারমিন ইয়াসমিনকে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নথি তলবের পাশাপাশি সরেজমিনে তদন্ত। তদন্ত কমিটির কার্যক্রমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সামনে এসেছে বরিশালে এসে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি। একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, গত সপ্তাহে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক যুগ্মসচিব মোঃ মখলেছুর রহমান ও সদস্য উপসচিব মিজ্ শারমিন ইয়াসমিন বরিশালে এসে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তারা জেলা প্রশাসনের বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারী, উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), কয়েকজন সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন। শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য নেওয়া নয়, তদন্তের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে লিখিত, ভিডিও ও মৌখিক বয়ান গ্রহণ করা হয়েছে বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তদন্ত কমিটি কার কাছে কী বিষয়ে জানতে চেয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা প্রকাশ্যে কিছু বলতে রাজি না হলেও একাধিক সূত্রের ভাষ্য, সাবেক জেলা প্রশাসকের দায়িত্বকালীন বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম, অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনা, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট নথির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মিল-অমিল যাচাই করতেই এসব বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটির বরিশাল সফরের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, ১৯ দফা নথি ও তথ্য চাওয়ার পাশাপাশি সরাসরি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাংবাদিকদের বক্তব্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে অভিযোগগুলোর পেছনের তথ্য ও ঘটনার বাস্তবতা যাচাইয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রতিবেদকের কাছে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নির্বাচনী বরাদ্দের হিসাব থেকে তদন্ত শুরু। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য চেয়ে পাঠানো ১৯ দফার প্রথমেই রয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে বরিশাল জেলায় নির্বাচন কমিশনের খাতওয়ারি বরাদ্দের তথ্য। একই সঙ্গে নির্বাচন কাজে নিয়োজিত সব এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়া অর্থের বিতরণ বিবরণী এবং নির্বাচন কমিশনের বরাদ্দ থেকে সম্মানি ছাড়া অন্যান্য খাতে ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের অনুমোদিত ভোটকেন্দ্র, ভোটকক্ষ ও দুর্গম কেন্দ্রের তালিকা এবং হিজলা, মুলাদী ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের পাঠানো দুর্গম কেন্দ্রের জন্য মূল প্রস্তাবও চেয়েছে তদন্ত কমিটি। দুর্গম কেন্দ্রের প্রস্তাব সংশোধন করে পাঠানো হয়ে থাকলে তার কারণ, অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণাদিও চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন থেকে দুর্গম কেন্দ্র বাবদ পাওয়া অতিরিক্ত ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের কপি এবং সংশ্লিষ্ট দুর্গম উপজেলার ইউএনওদের অতিরিক্ত বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ের বিবরণও চাওয়া হয়েছে।
দুর্গাসাগর দীঘির সংস্কার ও ২২ কর্মচারীর নিয়োগও তদন্তে। তদন্তের আওতায় এসেছে দুর্গাসাগর দীঘি সংস্কার ও আধুনিকায়ন সংক্রান্ত বিষয়ও। এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার বা মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া কোনো প্রস্তাব, সুপারিশ কিংবা নির্দেশনার কপি চাওয়া হয়েছে। দুর্গাসাগর দীঘি পরিচালনায় বর্তমানে কর্মরত ২২ জন কর্মচারীর নিয়োগ প্রক্রিয়া, বেতন কাঠামো এবং আউটসোর্সিংয়ের চুক্তিনামাও চেয়েছে তদন্ত কমিটি। একই সঙ্গে দুর্গাসাগর দীঘি ব্যবস্থাপনার কোনো নীতিমালা থাকলে সেটিও চাওয়া হয়েছে। শিল্প ও বাণিজ্য মেলার অনুমোদন নিয়ে নথি তলব। বরিশাল কালেক্টরেট স্কুল ও কলেজ প্রাঙ্গণে ‘বরিশাল শিল্প ও বাণিজ্য মেলা’ আয়োজনের অনুমোদন সংক্রান্ত আবেদনপত্র ও অনুমোদনপত্রও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। মেলা বন্ধে হাইকোর্ট বিভাগের আদেশ বা নিষেধাজ্ঞার কপি, মেলা আয়োজনের অনুমোদন বাতিলের আদেশ এবং মেলা বন্ধের লক্ষ্যে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসনের আয়োজিত সংশ্লিষ্ট সভার কার্যবিবরণীও চাওয়া হয়েছে। ফ্রন্ট ডেস্ক স্থানান্তর ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের নথিও তদন্তে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, বরিশাল এবং বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, বরিশালের পরিদর্শন প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। এছাড়া ফ্রন্ট ডেস্ক স্থানান্তরের নির্দেশনা এবং তা বাস্তবায়নে গৃহীত কার্যক্রমের সংশ্লিষ্ট নথিও চেয়েছে তদন্ত কমিটি। ৮৩টি পদে নিয়োগে বিলম্ব কেন? তদন্তের আওতায় এসেছে জেলা প্রশাসনের অধীন শূন্যপদ ও নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ও। জেলা প্রশাসন, বরিশালের আওতাধীন শূন্যপদের তালিকা ও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির কপি এবং আওতাধীন ৮৩টি পদে নিয়োগে বিলম্বের কারণ জানতে চেয়েছে তদন্ত কমিটি। ১৯ দফা নথি, সরেজমিন জিজ্ঞাসাবাদ প্রশ্ন প্রশাসনের অন্দরমহলে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, জেলা প্রশাসক মোঃ খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কাছে দাখিল করা অভিযোগ এবং বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্যই কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সরকারি এই নথিতে সরাসরি কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এমন কথা বলা হয়নি। তদন্ত কমিটি মূলত অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রমের বাস্তবতা উদঘাটনে নথি ও তথ্য সংগ্রহ করছে। তবে একসঙ্গে ১৯ দফা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথি তলব এবং পরবর্তীতে তদন্ত কমিটির দুই সদস্যের বরিশালে এসে বর্তমান জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার ঘটনায় প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচন-সংক্রান্ত অর্থ ব্যয়, দুর্গম কেন্দ্রের অতিরিক্ত বরাদ্দ, দুর্গাসাগর দীঘির সংস্কার ও ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য মেলার অনুমোদন, ফ্রন্ট ডেস্ক স্থানান্তর, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং ৮৩টি পদে নিয়োগে বিলম্ব এমন একাধিক পৃথক বিষয় একই তদন্তের আওতায় আসায় তদন্তের ব্যাপ্তি নিয়েও আলোচনা চলছে।
এখন তদন্ত কমিটির তলব করা নথি, বরিশালে সরেজমিনে নেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাংবাদিকদের বক্তব্য, লিখিত-ভিডিও-মৌখিক বয়ান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর সাবেক জেলা প্রশাসক মোঃ খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বাস্তবতা কতটুকু এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো প্রশাসনিক অনিয়ম বা বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ঘটেছিল কি না তা তদন্ত প্রতিবেদনে কীভাবে উঠে আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। এবিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।



