বরিশাল
বরিশালে মামলা বাণিজ্যের মাস্টারমাইন্ড মারযুক আব্দুল্লাহকে খুঁজছে পুলিশ
প্রয়াত আর জেলে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাসহ বরিশালে মামলা বাণিজ্যের মাস্টারমাইন্ডখ্যাত ছাত্রশক্তির নেতা মারজুক আব্দুল্লাহকে খুঁজছে পুলিশ। রোববার বিষয়টি জানিয়েছেন বরিশালের পুলিশ কমিশনার আশিক সাঈদ। পটুয়াখালীর দুমকি থানায় ডাকাতি চেষ্টার মামলায় মারজুক ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে মারজুকের সর্বশেষ মিথ্যা মামলায় আসামির তালিকায় নাম থাকা বেশ কয়েকজনের কাছে এরই মধ্যে টাকা চাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আসামির তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার শর্তে ওই টাকা চাওয়া হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। এছাড়া এ মিথ্যা মামলার আসামির তালিকায় বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতার নামও ঢোকানো হয়েছে। অথচ মামলার অভিযোগে আসামির তালিকায় থাকা ২৪৮ জনের সবাইকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী বলে উল্লেখ করেছেন মারজুক আব্দুল্লাহ।
জুলাই বিপ্লবের পর বরিশালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (বৈছাআ) নেতা হিসাবে পরিচিতি পান মারজুক। ঝিনাইদহের বাসিন্দা মারজুকের নানাবাড়ি বাকেরগঞ্জের চরামদ্দি ইউনিয়নে। কয়েক বছর ধরে তিনি বরিশালের বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া করে থাকছেন। ৫ আগস্টের পর মারজুক প্রথম সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুসহ আওয়ামী লীগের ২৪৭ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। জুলাই আন্দোলনে হামলা, ভাঙচুর, গুলি আর মারধরের অভিযোগে দায়ের করা ওই মামলা দিয়েই বরিশালে প্রথমবার মামলা বাণিজ্যের মাস্টারমাইন্ড হিসাবে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে। আসামির তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে বহুজনের কাছ থেকে তখন তিনি মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করেন। মামলা বাণিজ্যের বিষয় নিয়ে সেসময় দেশের গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরে জুলাই বিপ্লবকেন্দ্রিক আরও একটি মামলা বাণিজ্যের চেষ্টা করেছিলেন মারজুক। কিন্তু প্রশাসনের তৎপরতায় সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরই মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বিলুপ্ত করা হলে জেলা সমন্বয়কের পদ হারান মারজুক। পরবর্তী সময়ে এনসিপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রশক্তি গঠিত হলে তাকে বরিশাল মহানগর কমিটির যুগ্মসাধারণ সম্পাদক করা হয়। নতুন এ পরিচয়ে আবারও তিনি নগরীতে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় নামেন। ঘোষণা দেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচন করার। পরে অবশ্য ছাত্রশক্তির কমিটি বাতিল করে কেন্দ্র।
দলীয় কোন পদ-পদবিতে না থাকাবস্থায় বৃহস্পতিবার বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নতুন আরেকটি মামলার আবেদন করেন মারজুক। এবার তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ ২৪৮ জনের বিরুদ্ধে বেশকিছু মিথ্যা অভিযোগ আনেন। অভিযোগটি মামলা হিসাবে রেকর্ড না করে তদন্তের জন্য বরিশালের উপপুলিশ কমিশনারকে দায়িত্ব দেন আদালত। মারজুকের নতুন এ মামলার খবর জানাজানি হওয়ার পর বরিশালে তোলপাড় শুরু হয়। কেননা এতে কবরে ও জেলে থাকা এইসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা হয়েছে বোমা ও ককটেল নিক্ষেপের অভিযোগ। ৮ আসামির নাম দুবার করে লেখা হয়েছে তালিকায়। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে তালিকায় ৬ জন বিএনপি নেতাকর্মীর নামও রয়েছে।
বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার বলেন, ‘এর আগেও এই ছেলে এরকম মামলা বাণিজ্য করেছে। নতুন করে আবার এ মামলা দেওয়ার পেছনেও নিশ্চয়ই কোনো খারাপ উদ্দেশ্য রয়েছে। মামলায় বিএনপির লোকজনের নাম দেওয়াটাই তো সন্দেহ আর উদ্বেগজনক।’
এদিকে মামলার বাদী মারজুক আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে একটি ডাকাতি চেষ্টার মামলা বর্তমানে পটুয়াখালীর আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। গত বছরের ৬ জুন পটুয়াখালীর পায়রা ব্রিজ এলাকায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ডাকাতি চেষ্টার অভিযোগে ওই মামলা করেছিল দুমকি থানা পুলিশ। মামলার অপর দুই আসামি গ্রেফতার হওয়ার পর জামিনে মুক্তি পেলেও মারজুকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। পুলিশের খাতায় পলাতক আসামি হয়েও মারজুক কী করে প্রায় ১ বছর ধরে বরিশালে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেটাই এখন প্রশ্ন। বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে বরিশালের পুলিশ কমিশনার আশিক সাঈদ বলেন, ‘আমি যেহেতু এখানে নতুন এসেছি, তাই বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তবে ওয়ারেন্টের কপি হাতে পেয়েছি। এখন তার (মারজুক আব্দুল্লাহ) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বরিশাল আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘যেহেতু অভিযোগটি তদন্তে আছে, তাই এটি নিয়ে টেনশনের কিছু নেই। তদন্তে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে এমনিতেই আদালত তা খারিজ করে দেবেন।’


