বরিশাল
বিসিএসে হ্যাটট্রিক করলেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসান
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় প্রথমে শিক্ষা ক্যাডার, এরপর দ্বিতীয় বার সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে প্রশাসন ক্যাডারে। এবার ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে পররাষ্ট্র ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে ধারাবাহিক সাফল্যে হ্যাটট্রিক করেছেন তিনি।
পর পর তিনটি বিসিএসে ক্যাডার হওয়ার এমন বিরল সাফল্যের নজির গড়েছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. হাসান মিয়া। তিনি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার মো. ছগির আকনের সন্তান। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনিই জ্যেষ্ঠ।
এর আগে ৪৫তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডার এবং ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন হাসান মিয়া। শুধু বিসিএসই নয়, কর্মজীবনে এখন পর্যন্ত মোট নয়টি সরকারি চাকরিতে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন হাসান মিয়া।
তার এই ধারাবাহিক সাফল্যে আনন্দিত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে নিজের নজিরবিহীন সাফল্য বাবা এবং শিক্ষা জীবনের প্রথম শিক্ষককেই উৎসর্গ করেছেন হাসান মিয়া। তাদের অনুপ্রেরণায় এই কৃতত্ব বলে মনে করেন তিনি। বাকি দিনগুলোতে দেশ এবং জনগণের সেবা করার স্বপ্ন মো. হাসান মিয়ার।
জানা গেছে, একাডেমিক জীবন থেকেই একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন হাসান মিয়া। অনার্সে বিভাগে প্রথম এবং মাস্টার্সে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সিজিপিএ অর্জনকারীদের মধ্যেও তিনি অন্যতম ছিলেন।
নিজের সফলতার গল্প বলতে গিয়ে হাসান মিয়া জানান, ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার। সেই স্বপ্নকে ধারণ করে এসএসসি ও এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ভালো ফল করার পর ভর্তি হন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে।
হাসান বলেন, শুনেছিলাম- বিভাগে সেরা পাঁচজনের মধ্যে থাকতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সেই লক্ষ্য নিয়েই পড়াশোনা শুরু করি। প্রথম সেমিস্টারে দ্বিতীয় হওয়ার পর প্রথম হওয়ার স্বপ্ন দেখি। পরে অনার্সে প্রথম এবং মাস্টার্সে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করি।
তবে নবীন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ায় শিক্ষক হওয়ার পথ যে কঠিন, সেটিও দ্রুত উপলব্ধি করেন পারলাম। মাস্টার্সের প্রথম সেমিস্টারের ফল আশানুরূপ না হওয়ায় বিসিএসের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। যদিও সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তুতি শুরু করিনি। ২০২২ সালের নভেম্বরে মাস্টার্সের লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর পূর্ণোদ্যমে বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করেন হাসান। এরপর ৪৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলে প্রিলিমিনারি উত্তীর্ণ হয়ে লিখিত পরীক্ষার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেন। তিনি বলেন, বরিশালে থাকাকালীন অনেকগুলো টিউশন করিয়েছি। টিউশন করানোই আমার প্রস্তুতিকে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী করেছে।
এদিকে ২০২৫ সালের এপ্রিলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে যোগ দেন হাসান মিয়া। তবে মাত্র সাড়ে চার মাস পর ৪৭তম ও ৪৯তম বিসিএস সামনে থাকায় চাকরি ছেড়ে আবারও প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেন তিনি। এরই মধ্যে বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (বিপিএটিসি) গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে সুপারিশ পান হাসান। ২০২৫ সালের নভেম্বরে সেখানে যোগদান করেন তিনি।
হাসান জানান, বিপিএটিসিতে যোগদানের মাত্র ছয় দিন পর ৪৭তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি পাওয়ায় তিনি প্রতিষ্ঠানটির রেক্টরের প্রতি কৃতজ্ঞ।
আরও একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, যেদিন সাভার থেকে বরিশালে লিখিত পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিলাম, সেদিনই ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয় এবং আমি প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হই। এরপরও সিদ্ধান্ত নিই সব পরীক্ষা দেব। পরে সেই সিদ্ধান্তই আমাকে পররাষ্ট্র ক্যাডারে পৌঁছে দিয়েছে।
সফলতার পেছনের অনুপ্রেরণার বিষয়ে হাসান বলেন, তার জীবনের প্রথম শিক্ষক ও সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তার বাবা। তিনি বলেন, আমার বাবা শূন্য হাত থেকে নিজের পরিশ্রমে অনেক কিছু অর্জন করেছেন। তার সংগ্রাম আমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করেছে। পাশাপাশি আমার শিক্ষক, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাও আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন।
নিজের সফলতার তিনটি মূল কারণও তুলে ধরেন তিনি বলেন, মহান আল্লাহর ওপর ভরসা ও দোয়া, মনোযোগ দিয়ে একাডেমিক পড়াশোনা এবং নিয়মিত টিউশন করানোর মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছেন হাসান মিয়া। তবে প্রস্তুতির সময় কঠোর কোনো রুটিন অনুসরণ করতেন না বলে জানান হাসান।
তার ভাষায়, টিউশন ও চাকরির পাশাপাশি প্রস্তুতি নেওয়া সহজ ছিল না। সময় পেলেই পড়তেন। ক্লান্ত লাগলে চা খেতেন, হাঁটতেন, নামাজ আদায় করতেন। এভাবেই নিজেকে সতেজ রাখতেন হাসান।
পররাষ্ট্র ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে হাসান বলেন, অর্পিত দায়িত্ব সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পালন করতে চাই। মহান আল্লাহ সহায় হলে একাডেমিক জ্ঞান, বিশ্লেষণী দক্ষতা ও যৌক্তিক চিন্তার মাধ্যমে দেশের মর্যাদা, জাতীয় স্বার্থ ও আত্মসম্মান রক্ষায় কাজ করতে চাই।



