বরগুনা
তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষের ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে বরগুনা
বরগুনার তালতলী ও খোট্টার চর, পায়রা নদীর মোহনায় নির্মিত কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঘিরে পরিবেশ ও মানুষের জীবিকার বড় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও দুর্নীতি চলে।
স্থানীয়দের দাবি, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে কেন্দ্রটি স্থাপিত হয়। সে সময় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও পরিবেশের উন্নতির আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তবে বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। প্রকল্প বিরোধী আন্দোলন উপেক্ষা করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তা চালু করা হয়। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী নেতা দ্রুত সম্পদের মালিক হন। পার্শ্ববর্তী শুভসন্ধ্যা চর থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে, যা পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
জেলেদের দাবি, বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত গরম পানি ও রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে পায়রা নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। ইলিশসহ বিভিন্ন মাছ এখন নদী ছেড়ে চলে যাচ্ছে। জয়ালভাঙার জেলে ইউনুস আলী জানান, একসময় এক রাতেই কয়েক হাজার টাকার মাছ পাওয়া যেত; এখন তিন-চার দিন নদীতে জাল ফেলেও মাছ পাওয়া যায় না।
কৃষকরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। নিশানবাড়িয়ার আবদুস সালাম মাতুব্বর বলেন, আগে নারিকেল ও সুপারি বিক্রি করে বছরে ভালো আয় হতো। এখন গাছে আগের মতো ফুল-ফল আসে না। অনেক গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে, ফলে কয়েক বছরের মধ্যে পুরো এলাকা গাছশূন্য হয়ে যেতে পারে।
স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্র থেকে উৎপন্ন ছাই বা ফ্লাই অ্যাশ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে না, যা বাতাস ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। স্থানীয় গৃহিণী রহিমা বেগম বলেন, ধোঁয়া ও ছাইয়ের কারণে শিশু ও বয়স্করা অসুস্থ হয়ে পড়ার ভয় আছে।’ স্থানীয় চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ত্বকের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট ও পানিবাহিত রোগের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’র বরগুনা জেলা শাখার সদস্য সচিব মুশফিক আরিফ বলেন, ‘ছাই, গরম পানি ও রাসায়নিক বর্জ্য নদী, জমি ও বাতাসে দূষণ সৃষ্টি করছে। তিনি সতর্ক করেছেন, কার্যকর নজরদারি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না করা হলে পায়রা নদীর এই অংশ দ্রুত মৃত নদীতে পরিণত হতে পারে।’
৩০৭ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রটি নির্মাণ শুরু হয় ২০১৭ সালে এবং ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি চালু হয়। এটি পরিচালনা করছে বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত হয়েছে চীনের পাওয়ার চায়না রিসোর্স ও বাংলাদেশের আইসোটেক গ্রুপ।
স্থানীয়রা দাবি করেন, উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা যেন প্রকৃতি, নদী ও মানুষের জীবন-জীবিকাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। তারা চাচ্ছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশ ও উপকূলীয় মানুষের স্বার্থ রক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত হোক।
বরগুনার মানুষের প্রত্যাশা: উন্নয়ন হবে, কিন্তু জীবনের বিনিময়ে নয়, না হলে পুরো অঞ্চল একটি ভয়াবহ পরিবেশ ও মানবিক সংকটের মুখে পড়বে।



