বরিশাল
বরিশালে সরিষার বাম্পার ফলন, মধু সংগ্রহে নেই উদ্যোগ
চলতি মৌসুমে বরিশালে সরিষার বাম্পার ফলন হলেও মধু সংগ্রহে উদ্যোগের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলায় এ বছর ৬ হাজার ৮শ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে। জেলার ১০টি উপজেলায় সরিষা চাষ হলেও দেশের উত্তরাঞ্চলের মতো এখানে মধু সংগ্রহের প্রচলন খুবই কম।
দেখা গেছে, শুধুমাত্র জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার রাকুদিয়া এলাকায় প্রতিবছর টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর থেকে একজন মৌয়াল এসে মৌচাষ করেন। এ বছরও তিনি সরিষা ফুল থেকে মধু আহরণের জন্য ১০০টি মৌ-বাক্স স্থাপন করেছেন। স্থানীয়ভাবে মধুর চাহিদা থাকলেও উদ্যোক্তার অভাবে জেলায় মধু উৎপাদন এখনো সীমিত।
মৌ-বাক্সে মৌমাছি পালন ও মধু সংগ্রহের পদ্ধতি পরিদর্শনে এসে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরিশালের উপ-পরিচালক (ডিডি) মরিয়ম আক্তার বলেন, আমাদের অঞ্চলে মাঠে প্রায় দুই মাস সরিষা ফুল থাকে। কিন্তু মৌ-উপযোগী ফল বা ফুলের বাগান না থাকায় সারা বছর রানি মৌমাছি বাঁচিয়ে রাখা ব্যয়বহুল ও জটিল। তবুও আমরা চাই বরিশালে মধু সংগ্রহকে কেন্দ্র করে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হোক। আগামীতে অন্যান্য উপজেলাতেও মৌবাক্স স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। উদ্যোক্তা তৈরির জন্য আমরা ওপর মহলে আলোচনা করবো।
তিনি আরও জানান, প্রাকৃতিক পরাগায়নের কারণে সরিষার উৎপাদন ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। আর সুনিয়ন্ত্রিত মৌচাষ হলে এ বৃদ্ধি ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সরিষায় ফুল ফোটার এই মৌসুমে বাবুগঞ্জ উপজেলার রাকুদিয়া গ্রামে কাঠের বাক্সে মৌমাছি রেখে মধু সংগ্রহ করেন মৌচাষিরা। বাক্সের ভেতরে মোমের তৈরি ফ্রেম বা সিট থাকে, যেখানে প্রতিটি বাক্সে প্রায় ৪৫-৫০ হাজার মৌমাছি বসবাস করে। রানী মৌমাছির আকর্ষণে শ্রমিক মৌমাছিরা ক্ষেতে গিয়ে ফুল থেকে নেক্টার বা মিষ্টি রস সংগ্রহ করে বাক্সে জমা করে। উপযুক্ত আবহাওয়ায় প্রতিটি বাক্স থেকে সপ্তাহে ২ থেকে ৪ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া যায়।
টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার হেমনগর এলাকা থেকে মধু সংগ্রহে আসা মৌয়াল মো. আয়নাল বলেন, প্রতি বছর দুই মাসের জন্য আমি বাবুগঞ্জে আসি সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহ করতে। মৌসুমে এখান থেকে এক লাখ টাকার বেশি মধু বিক্রি করি। সরিষা ফুল শেষ হলে মৌবাক্স নিয়ে ফরিদপুরে যাবো কালোজিরা ফুলের মধু সংগ্রহ করতে। আমরা সারাবছর দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মধুর খোঁজে ছুটে বেড়াই।
কৃষিবিদদের মতে, বরিশালে মৌচাষ সম্প্রসারিত হলে শুধু মধু উৎপাদনই বাড়বে না, সরিষার ফলনও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি মধুচাষকে কেন্দ্র করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তবে সারাবছর মৌমাছি পালনের অনুকূল পরিবেশ না থাকা, পর্যাপ্ত জ্ঞানস্বল্পতা ও বিনিয়োগের অভাবে অনেকেই এখনো এ পেশায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
স্থানীয় কৃষকরা মনে করেন, সরকারি উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দেওয়া হলে বরিশালেও উত্তরাঞ্চলের মতো মধু উৎপাদন লাভজনক খাতে পরিণত হতে পারে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, এ বছর উপজেলায় ৫৩০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের সরিষা চাষ হয়েছে। রাকুদিয়া এলাকায় সরিষার আবাদ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় ফরিদপুর থেকে একজন মৌয়াল প্রতিবছর বাক্স স্থাপন করে মধু সংগ্রহ করেন।
তিনি আরও বলেন, আমি সেখানে গিয়ে দেখেছি-মানুষ আগ্রহ নিয়ে মধু সংগ্রহের পদ্ধতি দেখছেন এবং নিজেদের জন্য মধু কিনছেন। সরকার উদ্যোগী হলে বরিশালে সরিষার ফলন আরও বাড়বে এবং স্থানীয় চাহিদা মেটানোর মতো মধু উৎপাদন সম্ভব হবে।



