বরিশাল
নির্বাচনী প্রচারণা থেকে বিরত থাকার ঘোষণা
বিতর্কিত আ’লীগ নেতার বিএনপিতে অনুপ্রবেশ
- তৃণমূলে ক্ষোভ ও বিক্ষোভ
- বিব্রত বরিশাল মহানগর বিএনপি
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ আওয়ামী লীগের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর নুরুল ইসলামের বিএনপিতে যোগদানকে কেন্দ্র করে বরিশাল নগরীর তৃণমূল বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে বিতর্কিত ওই ব্যক্তির বিএনপিতে যোগদানের ঘটনাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। এই ঘটনার প্রতিবাদে বরিশাল নগরীর ২৭ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদল নেতারা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত একজন ব্যক্তির বিএনপিতে অনুপ্রবেশ দলের ভাবমূর্তি, আদর্শ এবং দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের আত্মমর্যাদার জন্য হুমকিস্বরূপ।
জানা গেছে, গত রবিবার (২৫ জানুয়ারি) বরিশাল-৫ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ারকে ফুল দিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন নগরীর ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও কথিত ভূমিদস্যু নুরুল ইসলাম। এই ঘটনার পরপরই স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরদিন সোমবার ২৭ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশ্যে তাদের ক্ষোভ জানান।
সংবাদ সম্মেলনে তারা অভিযোগ করেন, নুরুল ইসলাম আওয়ামী লীগের শাসনামলে নগরীর সাবেক মেয়র খোকন আবদুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ওই সময় নির্বাচনী কেন্দ্র দখল, বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগও তোলেন তারা। ছাত্রদলের নেতারা আরও দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নুরুল ইসলাম সাধারণ মানুষের বিপুল পরিমাণ জমি অবৈধভাবে দখল করেন। একসময় রুটির কারখানার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে অল্প সময়েই তিনি কোটিপতি বনে যান।
শুধু তাই নয়, বিএনপির বহু নেতা-কর্মীকে গুম, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলায় জড়ানোর ক্ষেত্রে তিনি আওয়ামী লীগের সামনের সারির সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করেন বলেও অভিযোগ করা হয়। তারা বলেন, সে সময় নুরুল ইসলামের ওয়ার্ডে বিএনপির নেতা-কর্মীরা সভা-সমাবেশ করা তো দূরের কথা, নিজ নিজ বাড়িতেও নিরাপদে থাকতে পারেননি। সেই ব্যক্তি এখন রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যা তৃণমূলের জন্য চরম অপমানজনক ও উদ্বেগজনক।
এ বিষয়ে ২৭ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক তারেক বলেন, “বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে নির্যাতন ও দমন-পীড়নের নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক কাউন্সিলর নুরুল ইসলাম ওরফে ‘রুটি নুরু’ তার অপকর্ম আড়াল করে কতিপয় দালালের সহযোগিতায় বিএনপিতে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যা আমাদের গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। এর প্রতিবাদে আমরা ২৫ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে বিরত রয়েছি। আমাদের এই অবস্থান বিএনপির বিরুদ্ধে নয়, বরং সুবিধাবাদী ও অনুপ্রবেশকারী দালালদের বিরুদ্ধে। এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তির ধানের শীষের পক্ষে প্রচারণা করা দল ও নির্বাচনের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই আমরা দলের আদর্শ ও ত্যাগী নেতা-কর্মীদের আত্মমর্যাদা রক্ষায় বিএনপির হাইকমান্ডের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
এ বিষয়ে বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক বলেন, “আওয়ামী লীগের সাবেক কাউন্সিলর নুরুল ইসলাম কবে বা কীভাবে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন, সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। কেন্দ্রীয়ভাবে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতা-কর্মীদের দলে নেওয়ার বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আত্মরক্ষা কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থে কাউকে দলে নেওয়ার সুযোগ নেই।”
একই সুরে কথা বলেন বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব মো. জিয়াউদ্দিন সিকদার জিয়া। তিনি বলেন, “বিএনপি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। আদর্শে বিশ্বাসী যে কেউ দলে আসতে পারে, তবে অবশ্যই দলীয় নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে। নুরুল ইসলাম একজন বিতর্কিত আওয়ামী লীগ নেতা—তাকে দলে নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।”
এদিকে, এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বরিশাল-৫ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মজিবুর রহমান সরোয়ারের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকে সামনে রেখে বিতর্কিত ও সুবিধাবাদী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের প্রবণতা দলীয় শৃঙ্খলা দুর্বল করতে পারে এবং ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তৃণমূলের এই ক্ষোভ উপেক্ষা করা হলে এর প্রভাব আসন্ন নির্বাচনে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।



