বরিশাল
তিন শিক্ষকের কুটকৌশল ঘিরে সমালোচনার ঝড়
বদলি ঠেকাতে স্বেচ্ছায় মামলার আশ্রয়
মির্জা রিমন ॥ সরকারি স্কুল শিক্ষকদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বরিশালের তিন শিক্ষক নিজেদের বদলি ঠেকাতে স্বেচ্ছায় মামলার আশ্রয় নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক আন্দোলন শেষ হওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় বদলির চিঠি হাতে পেয়েই তাঁরা পরিকল্পিতভাবে মামলার নাটক সাজিয়েছেন। কেবল ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষায় সরকারি নিয়মকে কৌশল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসতেই সাধারণ জনগণ ও শিক্ষক সমাজের একটি অংশের মধ্যে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, গত ১ ডিসেম্বর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত রেখে পেশাগত মর্যাদা ও বেতন-ভাতাসহ চার দফা দাবিতে বরিশালে শিক্ষকরা আন্দোলনে নামেন। এ আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন বরিশাল জিলা স্কুলের সহকারী শিক্ষক মুহাম্মদ শাহাদাত হুসাইন এবং রুপাতলী সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. এ রাজ্জাক ও মো. আক্তারুজ্জামান। পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে ও নির্দেশনার পর আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়। আন্দোলন প্রত্যাহারের মাত্র নয় দিনের মাথায় গত ১০ ডিসেম্বর শিক্ষা প্রশাসন থেকে ওই তিন শিক্ষককে যথাক্রমে হাতিয়া, ভোলা ও কাউখালি উপজেলায় বদলির আদেশ জারি করা হয়।
একই প্রজ্ঞাপনে ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে বিমুক্ত হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এমন নির্দেশনা জারির পরপরই বদলি কার্যক্রম ঠেকাতে তিন শিক্ষক আইনি কৌশলের আশ্রয় নেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বদলির আদেশ কার্যকর হওয়ার আগেই গত ১৩ ডিসেম্বর তাঁরা স্বেচ্ছায় কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি মামলায় নিজেদের আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। মামলাটি নন-এফআইআর হিসেবে রুজু হয়। যার নম্বর ৪৯৮/২৫। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বিধিতে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা চলমান থাকলে তাঁর বদলি কার্যক্রম স্থগিত রাখার সুযোগকে সামনে রেখেই পরিকল্পিতভাবে এ আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়।
এদিকে মামলার সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ ডিসেম্বর নগরীর বিবির পুকুর পাড় এলাকায় ভীতিমূলক ডাক-চিৎকার করে জনশান্তি বিঘ্নের অভিযোগে তিন শিক্ষককে ১০৪ ধারায় গ্রেফতার দেখানো হয়। পরদিন ১৪ ডিসেম্বর তাঁদের ৮১ ধারার নন-এফআইআর মামলায় আদালতে পাঠানো হলে তাঁরা জামিন লাভ করেন। তবে মামলার বর্ণনার সঙ্গে বাস্তব ঘটনার একাধিক অসঙ্গতি উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই রাতে তিন শিক্ষকের কাউকেই থানায় আটক রাখা হয়নি। তাঁরা সরাসরি পরদিন আদালতে হাজির হয়ে জামিন নেন। অথচ মামলায় ‘সন্দেহমূলক গ্রেফতার’-এর উল্লেখ থাকায় প্রশ্ন উঠেছে মামলার স্বচ্ছতা নিয়ে।
এছাড়াও একই দিনে কোতোয়ালি থানার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া আসামি মিঠুন দেবনাথ, জাফর হাওলাদার ও সুমন দাসের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ১৩ ডিসেম্বর ওই তিন শিক্ষক কোতোয়ালি মডেল থানার গারদে ছিলেন না। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে রাতে তারা ঠিক কোথায় ছিলেন? সিসিটিভি ফুটেজ অনুসারে, ঘটনার সময় তারা টাউন হল, এরপর কোতোয়ালি মডেল থানা ও আদালত চত্বরে দেখা মেলেনি। সূত্রের খবর, বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে এই তিন শিক্ষক তাদের বদলি ঠেকাতে ‘গ্রেফতার নাটক’ সাজিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে থানার এক কর্মকর্তা জানান, এই পরিকল্পনায় একজন অ্যাডভোকেটের সঙ্গে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সেকেন্ড অফিসারের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে আসল সত্যতা। এ অসঙ্গতির বিষয়টি আরও প্রকট হয়ে ওঠে জিলা স্কুলের সহকারী শিক্ষক মুহাম্মদ শাহাদাত হুসাইনের বক্তব্যে। প্রতিবেদকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এক পর্যায়ে তাঁর বক্তব্যই পরস্পরবিরোধী হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে বরিশাল জিলা স্কুলের সহকারী শিক্ষক মুহাম্মদ শাহাদাত হুসাইন প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, “আমাদের টাউন হলের সামনে থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।” তবে মামলার কাগজে বিবির পুকুর পাড় থেকে গ্রেফতারের উল্লেখ থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। মামলায় পুলিশ ছাড়া অন্য কোনো সাক্ষী না থাকার বিষয়েও তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। গ্রেফতারের পর পরিবার বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সুযোগ হয়নি।” রাতে থানায় থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দীর্ঘ সময় নীরব থাকার পর বিষয়টি এড়িয়ে যান।
এ বিষয়ে বরিশাল জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, “যেদিন তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, সেদিন রাতে আমাকে কেউ কিছু জানায়নি। পরদিন জামিনের পর শিক্ষক মুহাম্মদ শাহাদাত হুসাইন বিষয়টি আমাকে জানান। আমি পরবর্তীতে পুরো বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি।” আন্দোলনের সময় গ্রেফতার না করে দুই সপ্তাহ পর কেন এই মামলা ও গ্রেফতার দেখানো হলো এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “এর জবাব সংশ্লিষ্ট শিক্ষকই ভালো দিতে পারবেন।” তবে তিনি জানান, সরকারি বিধি অনুযায়ী মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট শিক্ষক নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে পারেন না। এ বিষয়ে রুপাতলী সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অপর দুই শিক্ষক মো. এ রাজ্জাক ও মো. আক্তারুজ্জামানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট মামলার এসআই পার্থ সারতী জানান, গ্রেফতারের সময় তিন শিক্ষকের আচরণ স্বাভাবিক ছিল না। তাঁদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে বোঝা যাচ্ছিল যে, তারা সরকারি স্কুলের শিক্ষক নন। এসআই আরও বলেন, শিক্ষকরা নিজেদের পরিচয় দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছিলেন যে, তারা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু ঘটনার সময় কেন তারা টাউন হল এলাকায় বসে উচ্চস্বরে তর্কে লিপ্ত ছিলেন, তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি। এই কারণে তাদেরকে থানায় নিয়ে আসা হয়েছিল। থানায় নিয়ে আসার পরও কেন তাদের পরিচয় ও পেশা যাচাই করা হয়নি, এমন প্রশ্নের উত্তরে এসআই পার্থ সারতী বলেন, “তারা যা পরিচয় দিয়েছেন, সেটাকেই আমরা ভিত্তি হিসেবে নিয়েছি। সব সময় প্রত্যেক ব্যক্তির রেকর্ড যাচাই করা বা তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা আছে কি না তা সব ঘটনায় নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।” পরবর্তীতে বিষয়টি ওসিকে জানানো হলে, তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন মামলাটি নন-প্রসিকিউশনে পাঠানোর জন্য। তবে এ বিষয়ে ওসি কিছুই জানেন না এমন কথা জানালে তিনি বলেন, “সব মামলার প্রতিটি বিস্তারিত কি সব সময় তার মনে থাকে? এসব ছোটখাটো বিষয়ে হয়তো তার মনে নেই।”
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনা আমার জানা নেই। তিনজন সরকারি স্কুলের শিক্ষক গ্রেফতার হলে তো পুলিশ ও মিডিয়ায় জানার কথা। বিষয়টির খোঁজখবর নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বদলি ঠেকাতে ইচ্ছাকৃতভাবে মামলার আশ্রয় নেওয়া হলে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং শিক্ষকতার মতো সম্মানজনক পেশার নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে। তিন শিক্ষকের এই মামলাকেন্দ্রিক কৌশল এখন সামাজিক ও পেশাগত নৈতিকতার আলোচনায় ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।



