বরিশাল
দুই দশক পর স্বীকৃতি
স্থায়ী হলেন বিসিসির ৬১ কর্মচারী
মির্জা রিমন ॥ দীর্ঘ দুই দশকের অপেক্ষার প্রহর ভেদ করে অবশেষে চাকুরি স্থায়ীকরণের আলো দেখলেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) ৬১ জন কর্মচারী। বছরের পর বছর আশ্বাস, আন্দোলন ও প্রশাসনিক টানাপোড়েনের পর প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষরে স্থায়ীকরণের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ায় স্বস্তি ও আনন্দে ভাসছে ৬১টি পরিবার।
বিসিসি সূত্রে জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান ৬১ জন কর্মচারীকে স্থায়ীকরণের অনুমোদনে স্বাক্ষর করেন। এর আগে সোমবার (৫ জানুয়ারি) একই অনুমোদনে স্বাক্ষর করেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা ও নাটকীয়তার কার্যত অবসান ঘটে। জানা গেছে, সর্বশেষ গত ৮ ডিসেম্বর ৬১ কর্মচারীর স্থায়ীকরণ বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে কর্মচারীদের নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র, আদালতের রায়, সিটি করপোরেশন চাকুরি বিধিমালা-২০১০ এবং বিদ্যমান প্রশাসনিক প্রক্রিয়া গভীরভাবে পর্যালোচনা করেন। পর্যালোচনা শেষে কমিটি স্থায়ীকরণের সুপারিশ প্রদান করে। পরে করপোরেশনের অর্গানোগ্রামে বিদ্যমান শূন্য পদগুলোর তথ্য যুক্ত করে পুনরায় সুপারিশপত্র দাখিল করা হয়। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্থায়ীকরণের অনুমোদনে স্বাক্ষর করেন। এর আগে সাবেক প্রশাসক রায়হান কাওছার গত ৬ আগস্ট বরিশাল সিটি করপোরেশনের এক সাধারণ সভায় ৬১ জন কর্মচারীকে স্থায়ীকরণের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন দিলেও তা বাস্তবায়ন না করেই দায়িত্ব ছাড়েন। এতে কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা ও অনাস্থা আরও গভীর হয়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
এ বিষয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী বলেন, “৬১ জন কর্মচারীর স্থায়ীকরণের বিষয়টি পুরোপুরি সঠিক এবং এটি একটি আইনসম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মহোদয় তাদের স্থায়ীকরণের অনুমোদনে স্বাক্ষর করেছেন। এর আগে গঠিত সাত সদস্যের কমিটির সুপারিশ, নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র এবং প্রশাসনিক সব দিক পর্যালোচনা করে আমি আমার স্বাক্ষর প্রদান করি। বিশেষ করে উচ্চ আদালতের একটি স্পষ্ট রায় এই সিদ্ধান্তের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন চাকুরি বিধিমালা-২০১০ অনুসরণ করেই স্থায়ীকরণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে এ বিষয়ে কোনো ধরনের আইনগত জটিলতা নেই। দীর্ঘদিন ধরে যারা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন, তাদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
এ বিষয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, “বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৬১ জন কর্মচারীর স্থায়ীকরণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি চূড়ান্ত করার আগে আমি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করি। কমিটি সংশ্লিষ্ট সব নথিপত্র, আইনগত বিষয় ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে সুপারিশ প্রদান করে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই তাদের স্থায়ীকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
উল্লেখ্য, ২০০৩ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচিত সাবেক মেয়র অ্যাডভোকেট মজিবুর রহমান সরোয়ার বিভিন্ন পদে ১২১ জনকে নিয়োগ দেন। পরে এক-এগারোর সময় ভিন্ন ভিন্ন স্মারকের মাধ্যমে তাদের সবাইকে চাকরিচ্যুত করা হয়। ২০১০ সালে হাইকোর্ট এসব কর্মচারীকে স্ব-স্ব পদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। তবে তৎকালীন মেয়র শওকত হোসেন হিরনের সময় তারা যোগদান করতে পারেননি। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে আহসান হাবীব কামাল মেয়র নির্বাচিত হলে পুনরায় তাদের যোগদান সম্পন্ন হয়। কিন্তু স্থায়ী না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে তারা প্রতি ১০ বছর পর গ্রেড পরিবর্তনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। পাশাপাশি অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ার আশঙ্কাও তাদের পিছু ছাড়েনি।
সিটি করপোরেশন চাকুরি বিধিমালা-২০১০ অনুযায়ী এসব কর্মচারীর স্থায়ীকরণে কোনো আইনি বাধা ছিল না। বিধিমালার ৫৭(১) ধারার ক্রান্তিকালীন বিশেষ বিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে ২০১০ সালের বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পূর্বে সরকারি বিধি মোতাবেক অস্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে কর্মরত ব্যক্তিরা করপোরেশনের চাকরিতে ‘নিয়মিত’ হিসেবে গণ্য হবেন। এই বিধান ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিশ্লেষণ করেই অবশেষে বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত ৬১ জন কর্মচারীকে স্থায়ী করা হলো। দীর্ঘ আন্দোলন, অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার পর স্থায়ীকরণের অনুমোদন পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। তাদের ভাষায় এ সিদ্ধান্ত শুধু চাকরির নিরাপত্তাই নয়, বরং পরিবার ও ভবিষ্যৎ জীবনের নিশ্চয়তাও এনে দিয়েছে।


