বরিশাল সদর
মাদক সেবন ও অনৈতিক কর্মকান্ডের নিরাপদ ডেরা নগরীর আবাসিক হোটেলগুলো
এস.এন.পলাশ ॥
মাদক সেবন ও অনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে বরিশাল নগরীর আবাসিক হোটেলগুলো। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বেশিরভাগ হোটেলগুলো ঘণ্টা চুক্তিতে রুম ভাড়া দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। নগরীর আবাসিক হোটেলগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকার দায়ে প্রায়ই নারী-পুরুষকে গ্রেপ্তার করছে পুলিশ। তবু হোটেলগুলোতে থামছে না অসামাজিক কার্যকলাপ।
প্রশাসনের অসাধু কতিপয় কর্তাব্যক্তি ও সাংবাদিক নামধারী বিশেষ মহলকে ম্যানেজ করেই চলছে এ ধরণের কর্মযঞ্জ। তাই প্রশাসনের অভিযানের সময় এসব হোটেলের মালিকরা থাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ। এদের বিরুদ্ধে নেয়া হয় না কোন আইনি ব্যবস্থা। তবে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও কোতয়ালী থানার ওসির নানামুখী তৎপরতায় আবাসিক হোটেলগুলোতে পতিতাবৃত্তি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও দেদারছে চলছে মাদক সেবন। বর্তমানে করোনা মহামারির কারনে প্রশাসনের নজরদারির অভাবে বেড়ে গেছে এসব অনৈতিক কর্মকান্ড।
সরজমিন সূত্রে দেখা যায়, স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীসহ সকল অবৈধ মেলামেশার নিরাপদ স্থান বর্তমানে বরিশাল নগরীর আবাসিক হোটেলগুলো। চিহ্নিত পতিতাবৃত্তি করা গুটি কয়েক হোটেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলামান থাকলেও নজর নেই বাকি হোটেলগুলোতে। বরিশাল নগরীর ছোট-বড় বেশিরভাগ হোটেলগুলোতে চলছে ঘণ্টা চুক্তিতে এই কর্মকান্ড। বাদ নেই নামকরা হোটেলগুলো, সেখানেও দেখা যাচ্ছে একই চিত্র।
অভিযোগ রয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিয়ে ও চাকুরি প্রলোভনে ফুসলিয়ে বা অপহরণ করে নিয়ে আসা কিশোরী-তরুণী ও যুবতীদের হোটেলে আটকে রাখা হয় এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের দিয়ে চালানো হয় রমরমা দেহব্যবসা। এছাড়াও কিছু কিছু হোটেলগুলোতে প্রেমিক যুগল এবং বয়ফেন্ড-গার্লফ্রেন্ডদেরকে নাম-ঠিকানা এন্ট্রি ছাড়াও রুম ভাড়া দেয়া হয় এবং ব্লাক মেইলের মাধ্যমে আদায় করা হয় দ্বিগুণ-তিনগুণ টাকা।
শুধু অনৈতিক কর্মকান্ড নয়, এসব হোটেলগুলোতে বসে মাদকের আসর। এদের বেশিরভাগই নিরাপদে ইয়াবা সেবনের জন্য হোটেলর রুম ঘন্টা চুক্তিতে ভাড়া নেয়। এসকল কর্মকান্ডে জড়িত হোটেলগুলোর মধ্যে অন্যতম সদর রোডে মানিকের পরিচালিত হোটেল সামস, নথুল্লাবাদের শরিফ হোটেল, হোটেল ব্যবিলন, রুপাতলির মেট্রোপলিটন হোটেল, হোটেল অবকাশ, হাসপাতাল রোডের হোটেল প্যারাডাইস, বান্দরোড শেবাচিম হাসপাতালের সামনে হোটেল মিডসিটি, হোটেল কিং, হোটেল খান, পোর্টরোড এলাকার আবাসিক হোটেল জোনাকি ও মহসিন মার্কেট লাগোয়া হোটেল ঝিনুক, পোর্টেরোড ভূমি অফিসের সামনে স্বাগতম, সী-প্যালেস পোর্টরোডে হোটেল চিল, হোটেল কীর্তনখোলা, নিউ পপুলার, হোটেল অতিথি, কাটপট্টিতে নক্ষত্র প্যালেস, লাইন রোডে হোটেল নুপুরসহ বেশ কয়েকটি হোটেলেই চলছে হরদমে দেহব্যবসা। এছাড়াও হোটেল এথেনা, এরিনা, রোদেলাসহ নামীদামী হোটেলগুলোও থেমে নেই এসকল কর্মকান্ড। যাহার প্রমাণ মিলবে হোটেলে থাকা সিসি ক্যামেরার ফুটেজগুলোতে।
শুধু তাই নয়, অবৈধ ও অনৈতিক কর্মকান্ডের কারণে এসকল হোটেলগুলোতে হত্যা ও আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। তবুও বন্ধ হচ্ছে না এসকল কর্মকান্ড। সরেজমিনে সূত্রে জানা গেছে যায়, মহসিন মার্কেটে হোটেল ঝিঁনুক, হোটেল ভোলা, পোর্টরোড সি-প্যালেস, হোটেল স্বাগতমসহ কয়েকটি হোটেলে আবাসিক সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেহব্যবসা পরিচালনা করছে আজিজ। অপরদিকে পোর্টরোডে হোটেল চিল নিয়ন্ত্রণ করে আল আমীন।
এছাড়াও পতিতা ব্যবসায়ী মনিরের রয়েছে একাধিক হোটেল। প্রতিটি হোটেল তার শ্যালক আল আমিনকে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করায়। বিউটি রোডের গলির ভিতরে একাধিক হোটেলের মালিক ওই মনির। পোর্টরোড ব্রীজ সংলগ্ন স্থানীয় শুক্কুর মিয়ার ছেলে ফয়সাল, ইসমাইল ৩টি পতিতা হোটেল পরিচালনা করে। এদের রয়েছে আল-আমিন, ইসমাইলসহ একাধীক সহযোগী। এরা প্রশাসনের হাতে একাধিকবার আটক হয়ে কারাভোগ করেছে।
সূত্রেমতে, চলতি বছরের মার্চ মাসেই নগরীর দুটি আবাসিক হোটেল থেকে দুই যুবকের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নগরীর সাহেবের গোরস্থান রোড সংলগ্ন আবাসিক হোটেল এরিনার ৬০৮ কক্ষের বিছানায় পড়ে ছিল মিরন হালদার নামের এক যুবকের লাশ। পাশে বেশ কিছু চেতনানাশক ইঞ্জেকশন আর সিরিঞ্জও পড়ে ছিল। পুলিশের ধারণা, ওই ইনজেকশন পুশ করার পর তার মৃত্যু হয়েছে। মিরনের বাড়ি জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার ভাতশালা গ্রামে। এ ঘটনায় কোতয়ালি থানায় একটি মামলা হয়েছে।
অন্যদিকে, শনিবার (২০ মার্চ) বিকালে নগরীর নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার শরীফ আবাসিক হোটেলের ১২৬ নম্বর কক্ষ থেকে আল আমিন নামের আরেক যুবকের লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। আল আমিনের মৃত্যুর ঘটনায় বরিশাল এয়ারপোর্ট থানায় অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছেন তার স্বজনরা।
গত বছর ডিসেম্বর মাসে নগরীর হেমায়েত উদ্দিন রোডের আরজু বোর্ডিং এর ১৮নং কক্ষ থেকে জালাল উদ্দিন (৫০) নামের এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। সেখানেও পুলিশ ধারনা করেছিল অতিরিক্ত নেশার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। এভাবে প্রত্যেক বছর নগরীর হোটেলগুলো ভাড়া নিয়ে অতিরিক্ত মাদক সেবনে মৃত্যুর কারন ঘটেই চলছে।
এ বিষয়ে নগর গোয়েন্দা শাখার সহকারী পুলিশ কমিশনার নরেশ কর্মকার বলেন, হোটেলে অবৈধ কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান আছে এবং থাকবে।
এ প্রসঙ্গে নগর গোয়েন্দা শাখার অপর কর্মকর্তা ডিসি মঞ্জুর রহমান বলেন, আমরা সবসময় যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স রেখেছি এবং এসকল হোটেল গুলো আমাদের নজরদারীতে রয়েছে আমরা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালাবো।