জাতীয়
বাংলাদেশে হেফাজতে নির্যাতন: আইন আছে, কিন্তু সুরক্ষা কোথায়?
মোঃ আবুল হাসান সাগর, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ॥ বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হওয়া বহু নাগরিক এখনো থানায় নির্যাতনের আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটান। আইনগত সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা রোধে ২০১৩ সালে বিশেষ আইন প্রণয়ন করা হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ এখনো অত্যন্ত সীমিত। ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩’ থাকার পরও বিভিন্ন অভিযোগে দেখা যায়—গ্রেপ্তারের পর বা জিজ্ঞাসাবাদের সময় অনেক নাগরিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি হন। সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, দুর্বল নজরদারি ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রভাব, দায়মুক্তির সংস্কৃতি এবং জবাবদিহির অভাব এই সমস্যাকে আরও গভীর করেছে। গবেষকরা বলছেন, হেফাজতে নির্যাতনকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যাবে না। বরং এটি একটি দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা কাঠামোগত সমস্যা। পুলিশের অভ্যন্তরীণ দুর্বল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের প্রবণতা, গ্রেপ্তারের পর দ্রুত আইনজীবীর সহায়তা না পাওয়া এবং থানায় স্বাধীন পর্যবেক্ষণের অনুপস্থিতি—এসব কারণে নির্যাতনের বহু ঘটনা অভিযোগের স্তরেও পৌঁছায় না। পরিবার অভিযোগ করলেও তদন্ত অনেক সময় ধীরগতির, অসম্পূর্ণ বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে অকার্যকর থাকে। ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।
যুক্তরাজ্যঃ স্বচ্ছতা ও স্বাধীন নজরদারির শক্তিশালী মডেল; যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ ও হেফাজত ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর আইন ও নীতিমালা অনুসরণ করছে। ১৯৮৪ সালে দেশটি Police and Criminal Evidence Act (PACE) প্রণয়ন করে, যা পুলিশি ক্ষমতা ও জিজ্ঞাসাবাদে বড় পরিবর্তন আনে। এই আইনে জিজ্ঞাসাবাদ ভিডিও রেকর্ড করা বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া রয়েছে Custody Officer একজন স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, যিনি আটক ব্যক্তির নিরাপত্তা দেখভাল করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো Independent Office for Police Conduct (IOPC) একটি স্বাধীন সংস্থা, যা পুলিশি মৃত্যু, নির্যাতন কিংবা অভিযোগ তদন্ত করে। ফলে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পুলিশ নিজেরাই পায় না।
যুক্তরাষ্ট্রঃ অধিকার, আদালত ও বহুস্তরীয় নজরদারির সমন্বয়; যুক্তরাষ্ট্রে হেফাজতে অধিকার সুরক্ষা মূলত আদালতের নির্দেশনা ও সংবিধানের ভিত্তিতে পরিচালিত। ১৯৬৬ সালের বিখ্যাত মামলা Miranda v. Arizona এর রায়ের পর পুলিশ যে কোনো গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে তার অধিকার—চুপ থাকার অধিকার ও আইনজীবী পাওয়ার অধিকার—জানাতে বাধ্য। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে বহুমুখী নজরদারি ব্যবস্থা। Civilian Review Board: সাধারণ নাগরিকদের নিয়ে গঠিত অভিযোগ তদন্তকারী সংস্থা। Internal Affairs: পুলিশের নিজস্ব তদন্ত ইউনিট। U.S. Department of Justice: কোনো ইউনিটে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের অভিযোগ থাকলে কেন্দ্রীয় সংস্থা সরাসরি তদন্তে নামে। এই বহুমাত্রিক ব্যবস্থার কারণে আইন ভাঙলে পুলিশের জবাবদিহি এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ কোথায় পিছিয়ে? গবেষণায় বাংলাদেশের চারটি বড় ঘাটতির কথা উঠে এসেছে— ১. স্বাধীন তদন্ত সংস্থার অভাব: পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ সাধারণত পুলিশই তদন্ত করে। ২. ২০১৩ সালের আইনের দুর্বল প্রয়োগ: ভয়, সামাজিক চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে খুব কম মামলাই সাজায় পৌঁছায়। ৩. জিজ্ঞাসাবাদে ভিডিও রেকর্ডিং নেই: রেকর্ড না থাকায় নির্যাতন প্রমাণ করা কঠিন হয়। ৪. রাজনৈতিক প্রভাব: বদলি, পদোন্নতি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অনেক সময় পেশাগত মানদণ্ডে নয়, রাজনৈতিক বিবেচনায় নির্ধারিত হয়।
সমাধানের পথ: কী করা যেতে পারে? যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশে কিছু বাস্তবসম্মত সংস্কার জরুরি— স্বাধীন পুলিশ অভিযোগ কমিশন গঠন, সব থানায় সিসিটিভি ও ভিডিও রেকর্ডিং বাধ্যতামূলক করা, গ্রেপ্তারের পর দ্রুত আইনজীবীর সহায়তা নিশ্চিত করা, থানায় বাহিরের পর্যবেক্ষকদের নিয়মিত আকস্মিক পরিদর্শন, পুলিশের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অভিযোগকারী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এসব ব্যবস্থা নির্যাতন পুরোপুরি বন্ধ না করলেও তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে এবং তদন্তকে আরও স্বচ্ছ করতে সহায়ক হবে।
কেন এখনই পরিবর্তনের সময়? হেফাজতে নির্যাতন কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়—এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। ২০১৩ সালের আইন প্রণয়ন ছিল গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন আনতে প্রয়োজন এর কঠোর প্রয়োগ এবং স্বাধীন নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়—স্বচ্ছতা, রেকর্ডিং, আইনি সহায়তা ও স্বাধীন তদন্ত এই চারটি উপাদান থাকলে হেফাজতে নির্যাতন কমে, জবাবদিহি বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ যদি এই মডেলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার গ্রহণ করে, তবে বহু বছরের দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভেঙে ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।



