জাতীয়
বজ্রপাতের কারণ ও বাচাঁর উপায়
মোঃ দুলাল হোসেন,নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ একটি নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল দিন-দিন বেড়ে যাচ্ছে কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও সিএফসি গ্যাস আর এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়েছে আমাদের পরিবেশের উপর ফলে অতিবৃষ্টি এবং বৈশ্বিক আবহওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে দেশে বজ্রপাতে মৃত্যু ও আহতের ঘটনা ঘটছে। সাধারণত মে মাস থেকে বাংলাদেশে ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বজ্রপাতে আহতরা স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়ার উপক্রম রয়েছে । বিশেষজ্ঞদের ধারনা, পৃথিবীতে বজ্রপাতে যত মানুষ মারা যায়, তার এক-চতুর্থাংশই বাংলাদেশে। হাওর, বাঁওড় ও বিল এলাকার জেলাগুলোয় বজ্রপাতে মৃত্যু বেশি। ঝড়-বৃষ্টির সময় খোলা মাঠ, নৌকা ও পথঘাটে যারা চলাচল করে তারাই এর শিকার।
বজ্রপাতের কারণ হিসেবে সাধারণত তাপমাত্রা ও বাতাসে সিসার পরিমাণ বৃদ্ধি, জনজীবনে ধাতব পদার্থের ব্যবহারের আধিক্য, মোবাইল ফোন ব্যবহার ও এর টাওয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি, বনভূমি বা গ্রামাঞ্চলে উঁচু গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস, জলাভূমি ভরাট ও নদী শুকিয়ে যাওয়া ইত্যাদিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞ মহল। আর এই সব কটির সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও উষ্ণায়নের সম্পর্ক আছে। বাংলাদেশে সাধারণত মে থেকে জুন মাসে বজ্রপাত বেশি হয়ে থাকে। এই সময়ে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতাও থাকে। মূলত জলবায়ু বৃদ্ধির কারণে এই দুটি দুর্যোগই বাড়ছে।
বজ্রপাতকে সরাসরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না। সবসময় এর জন্য নিজেকে প্রস্তুতি রাখাই উত্তম। বিশেষ করে বৈরী আবহাওয়ায় সময় সতর্ক থাকতে হবে। ঘন ঘন বজ্রপাত হতে থাকলে কোন অবস্থাতেই খোলা বা উঁচু স্থানে থাকা যাবে না। পাকা দালানের নিচে আশ্রয় নেওয়াই সুরক্ষার কাজ হবে। উঁচু গাছপালা ও বিদ্যুৎ লাইন থেকে দূরে থাকা কোথাও বজ্রপাত হলে উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বজ্রপাতের হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই এসব স্থানে আশ্রয় নেয়া যাবে না।বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ এবং বিদ্যুৎ পরিবাহী এমন কিছু স্পর্শ করা যাবে না। এমনকি ল্যান্ড লাইন টেলিফোনও স্পর্শ করা যাবে না।বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রের ব্যবহার থেকে বিরত থাকাবজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত সব যন্ত্রপাতি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার,ল্যাপটপ ইত্যাদির প্লাগ খুলে রাখতে হবে। এছাড়া বজ্রপাতের সময় গাড়ির ভেতরে থাকলে কোনো কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেয়াটা উত্তম ।
গাড়ির ভেতরের ধাতব বস্তু স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এ সময় মাঠে কর্মরত থাকলে তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে যেতে হবে। বাড়ির ছাদ কিংবা উঁচু কোনো স্থানে থাকলে দ্রুত সেখান থেকে নেমে যেতে হবে। বজ্রপাতের সময় নদী, জলাশয় বা জলাবদ্ধ স্থান থেকে সরে যেতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে একেকটি বজ্রপাতের সময় প্রায় ৬০০ মেগা ভোল্ট বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। একজন মানুষ কিংবা অন্য প্রাণীর মৃত্যুর জন্য কেবল ১০০ ভোল্ট বিদ্যুৎই যথেষ্ট। বজ্রপাতে মাত্র ১ সেকেন্ডেরও কম সময়ে একজন মানুষের মৃত্যু হয়। পানি বিদ্যুৎ পরিবাহী তাই সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। বজ্রপাতে সময় কয়েকজন জড়ো হওয়া অবস্থায় থাকা যাবে না। ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরে সরে যেতে হবে। কোনো বাড়িতে যদি পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না থাকে তাহলে সবাই এক কক্ষে না থেকে আলাদা আলাদা কক্ষে যাওয়া যেতে পারে।যদি বজ্রপাত হওয়ার উপক্রম হয় তাহলে কানে আঙুল দিয়ে নিচু হয়ে বসে চোখ বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু এ সময় মাটিয়ে শুয়ে পড়া যাবে না। মাটিতে শুয়ে পড়লে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।বজ্রপাতের সময় চামড়ার ভেজা জুতা বা খালি পায়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক। এ সময় বিদ্যুৎ অপরিবাহী রাবারের জুতা সবচেয়ে নিরাপদ।বাড়ি সুরক্ষিত করতে হবে বজ্রপাত থেকে বাড়িকে নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাড়ির চারদিকে নারকেল ও তাল জাতীয় গাছ লাগালে বজ্রপাত হলে ওইসব উঁচু গাছের ওপরই হবে। বজ্রপাতে আহত কাউকে বৈদ্যুতিক শকে আহতদের মতোই চিকিৎসা করতে হবে। সরাসরি মানুষের গায়ে পড়লে মৃত্যু অবধারিত। বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকে স্পর্শ করাও বিপজ্জনক। শুকনো কাঠ দিয়ে ধাক্কা দিতে হবে। হাসপাতালে নিতে হবে। তবে এ বিষয়ে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ জরুরি। তাছাড়া বজ্রপাতকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সমাজের সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সতর্কতা মূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। ফাঁকা স্থানে বেশি বেশি তালগাছ, নারিকেল গাছ ইত্যাদি লাগাতে হবে। এ গাছগুলো আকারে বিশাল হওয়ায় বজ্রঘাত থেকে মানুষকে নিরাপদে রাখে৷ বজ্রপাতে বেশি মারা যায় কৃষকেরা। তাই বজ্রপাতের সময় সব কাজ-কর্ম রেখে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিতে হবে।
সর্বোপরি আত্মসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এই দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে সরকারি ভাবে সচেতনতামূলক কর্মশালার আয়োজন করা উচিত এবং বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি প্রতিটি সরকারি -বেসরকারি, আবাসিক -অনাবাসিক এমনকি ব্যক্তিগত ভবন নির্মাণকালে বজ্রপাত নিরোধক রড অথবা সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক করা উচিত তাহলে কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে।