তালতলী
বরগুনার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে পায়রা-বিষখালী নদীর পানি
বরগুনার তালতলীতে চায়না রিসোর্স নির্মিত ৩০৭ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি চালু হয়। ৩০৭ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই প্রকল্পের বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন আর আশার আলো নয়, বরং এক ভয়ানক কালো ধোঁয়ার বিষাক্তে গ্রামবাসীর জীবনকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, সরকার পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে টেংরাগিরী বনের মাত্র ৩ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বনের গাছ, পশুপাখি, মাছসহ জীব-বৈচিত্র্যের ওপর। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গরম পানি, কয়লা পোড়ানো ছাই ও কালো ধোঁয়া এখানকার জীববৈচিত্র্য এখন ধ্বংসের পথে। কয়লাভিত্তিক এ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ওই এলাকা এমনকি এর আশপাশের পরিবেশরও বিপর্যয়ের কারণ হবে বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা। বিশেষ করে ফাতরারবন ও সংলগ্ন লোকালয়ের ওপর ব্যাপক পরিবেশগত ক্ষতিকর সম্ভাবনা রয়েছে। এতে ওই এলাকার মাটি, পানি ও বাতাসের দূষণসহ লবণাক্ততা ও তাপমাত্রা বাড়বে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পায়রা নদীর তীরে সাগর মোহনায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়েছে। ওই স্থানে বিষখালী নদীটিও সাগরে মিশেছে। এছাড়াও এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি থেকে মাত্র দুই কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় বন টেংরাগিরী (ফাতরার বন), শুভসন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত, টেংরাগিরী ইকোপার্ক ও নদীর অপর প্রান্তে রয়েছে হরিনঘাটা বন। ফলে একদিকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির বর্জ্য দুই নদীর পানিতে মিশে যেমন নদীর পানি দূষিত করছে তেমনি চিমনি দিয়ে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া পরিবেশ ও মানব জীবনের চরম ক্ষতি সাধন করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদন শুরু হওয়ার পর, এখানকার প্রতিটি ধূলিকণায় যেন এক ভয়ংকর অভিশাপের ছায়া পড়েছে।
আমরা তালতলী সমন্বয়ক আরিফুর রহমান বলেন, আমরা বারবার প্রতিবাদ জানিয়েছি, মানববন্ধন করেছি, কিন্তু প্রশাসন কানে তুলছেন না। বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির সময় শুভসন্ধ্যা সৈকতের সামনে সাগর মোহনা থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করায় সৈকতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। অপরূপ এই সৈকতটির অর্ধেরও বেশি সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিবেশের জন্য মারাত্মক, বিশেষ করে জলজ প্রাণী ও মানুষের জন্য।
তালতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক জানান, গত দুই মাসে চর্মরোগী ও হাঁপানি রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
স্থানীয় ইদ্রিস মিয়া বলেন, বিষাক্ত ধোঁয়ায় আমার ৫ বছরের শিশুটি বিভিন্ন ধরেন চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়েছে। শরীরের অনেক স্থানে লাল দাগ দেখা দিয়েছে। সরকার বিদ্যুৎ দিল, কিন্তু আমার মেয়ে কীভাবে বাঁচবে?।
শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদ মীর আলী বলেন, এই কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত বিষাক্ত পদার্থ আমাদের নদী ও সাগরের পানির গুণমানকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। অ্যালুমিনিয়াম, মিথেন, সালফার ডাই-অক্সাইড ও ভারী ধাতু পানিতে মিশে জলজ জীব বৈচিত্র্যের জন্য বিপদ তৈরি করছে। এ কারণে বিগত কয়েক বছর ধরে আশানুরূপ ইলিশ উৎপাদন হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অনুষদের প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান বলেন, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষতিকর বর্জ্য ও কয়লা নদীর পানিতে মিশে মৎস্য সম্পদের চরম ক্ষতি সাধন করছে। পলিবাহিটিক হাড্রোকার্বন ও বেনজো পাইরিং নামে জাতীয় একধরনের ক্ষতিকর পদার্থ আছে যা ক্যান্সার বহন করে। এই কয়লা থেকে উৎপন্ন হওয়া ধোয়া থেকে কার্বন, সালফার ও ফসফরাস ও থোরিয়ামের মতন পরিবেশ ধ্বংসকারী গ্যাস নিঃসরিত হয় যা বায়ু ও মাটিতে মিশে পরিবেশের চরম ক্ষতি সাধন করে।
উল্লেখ্য, এ প্রকল্পের ৪ শতাংশ শেয়ারের মালিক রয়েছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান আইসোটেক। প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।