বরিশাল
জুলাই যোদ্ধার তালিকায় নাম নেই গুলিবিদ্ধ কালুর
ফিরে দেখা সেই ২০২৪ সালের ভয়াল ১৭ জুলাই। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বরিশালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশের ফায়ার করা গুলিতে সুরুজ সিকদার কালু আহত হয়ে এখনও তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৪০টির বেশি গুলি নিয়ে বেঁচে আছেন। এখনও চলছে তার চিকিৎসা।
তবে কালু জুলাই আন্দোলনে আহত হয়ে সর্বস্ব হারালেও এখনো সরকারি সাহায্য জোটেনি তার কপালে।
গতবছর ১৭ জুলাই বরিশাল নগরীরর নথুল্লাবাদে পুলিশের গুলিতে কালু হাত-পায়ে, মাথা ও পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ হলেও এখনো সে সুস্থ নয়।
সর্বশেষ কয়েকদিন দিন পূর্বে গুলিবিদ্ধ কালুর পায়ে এবং হাতে ভিতরে থাকা ৬ টি স্টীল বুলেট বরিশালের বেসরকারি হসপিটালের সার্জারী বিভাগের সার্জন ডাঃ খালিদ অপারেশন করে গুলি বের করেন।
গত জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার সাথে আন্দোলনে নামেন এই গুলিবিদ্ধ কালু। তখন পুলিশের ছোড়া প্রায় শতাধিক গুলিতে আহত হন তিনি। আহতর পর থেকে কালুর চিকিৎসা করাতে করাতে পরিবারের সদস্যরা এখন অর্থিক ভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তবে এক কথায় বলা যাচ্ছে মানবেতর জীবনযাপন করছেন কালু। শুধু তাই নয় কালুর বুক চাপা কষ্ঠও রয়েছে ভিতরে।
জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার সাথে রাজপথে থেকে গুলিবৃদ্ধ হওয়ার পরও তিনি জুলাই সনদ থেকে বঞ্চিত। সরকারে পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত তার খোঁজ-খবর নেননি কেউ।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ যুবকটি হলেন বরিশাল মহানগর বিএনপির ২৯নং ওয়ার্ডের ১ নং সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক সুরুজ সিকদার ওরফে কালু। তিনি এখনও তার দেহের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের ছোড়া সেই গুলি নিয়ে যন্ত্রণায় কাতড়াচ্ছে।
সপ্তাহ খানেক আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় পরিবারের স্বজনরা কালুকে বরিশাল নগরীর বগুরা রোড বেঙ্গল হসপিটালে ভর্তি করেন। পরে চিকিৎসকরা তার পা-হাতের মধ্যে থাকা আরো চারটি গুলি অপারেশনের মাধ্যমে বের করেন। বর্তমানে কালু চিকিৎস্বাধীন অবস্থায় বাসায় রয়েছেন।
জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ওয়ার্ড বিএনপির নেতা সুরুজ সিকদার ওরফে কালু বলেন, বরিশাল নগরীর নতুল্লাবাদ এলাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে টানা কয়েকদিন ধরে কয়েক দফায় হামলা, গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিলো। তখন গোলাগুলি ও সহিংসতার সময় আমিও সাধারন জনতা হিসেবে আন্দোলনে অংশ গ্রহন করি। আন্দোলন চলাকালীন সময়ে আমাকে টার্গেট করেই পুলিশ গুলি ছুড়তে থাকেন। আর সেই পুলিশের ছোড়া শাতাধিক স্টীল বুলেট গুলিতে আমি আহত হই।
গুলিবিদ্ধ কালু আরো বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের বছর গড়ালেও, এখনও হাসপাতালে কোন রকম চিকিৎসা নিয়ে বেচে আছি। তার মধ্যে কিছু দিন পর পর অপারেশনের মাধ্যমে বের করতে হয় শরীরের ভিতরে থাকা স্টীল বুলেট গুলিগুলো। তাতে যে অর্থ ব্যায় করতে হয় তা বর্তমানে আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে। তার মধ্যে চিকিৎসক বলছে উন্নত চিকিৎসা করাতে। আমি উন্নত চিকিৎসা করাবো কি ভাবে তা ভেবে বুজতে পারছি না। কারন বর্তমানে আমার কাছে নেই অর্থ।
জুলাই আন্দোলনে আহত কালু কান্না জড়িত কন্ঠে আর চোখে পানি নিয়ে বলেন ভাই আমার ফ্যামিলি আছে। আমার ছেলে মেয়ে আছে। আমি উপার্জন করতাম। তা দিয়ে সংসার চলতো। কিন্ত জুলাই বিপ্লবের পর দীর্ঘ এক বছর ধরে অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পড়ে থাকা এবং আমার চিকিৎসা করাতে ফ্যামিলিটা এখন ধ্বংসের পথে। তার মধ্যে চিকিৎসকরা বলছে দ্রুত উন্নত চিকিৎসা করাতে।
দুঃখ প্রকাশ করে কালু বলেন, মোবাইলে দেখি বরিশাল শহরে এখন অতিথী নেতারা দাপট দেখাচ্ছে। তবে প্রশ্ন এরা কোথায় ছিলো এতো দিন। বিগত সময়ে এবং আন্দোলনের সময় এদের কাউকে দেখিনি তো রাজপথে। তবে আমি বলতে চাই মাঠ পর্যায়ের আহত কর্মীরা যেন অবহেলায় না থাকে, আমি সব কিছু ধ্বংস করেছি দলের জন্য, আর যতো দিন বেচে থাকবো ততদিন দলের জন্য এবং তারেক রহমানের নির্দেশ মেনে চলে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবো।
কালুর বড় ভাই শ্রমিক দলের নেতা সোহেল শিকাদর বলেন, ভাইদের মধ্যে কালু সেঝো। জুলাই আন্দোলনে কালু জীবন বাজি রেখে আন্দোলনে অংশ নেন। আর সেই আন্দোলনে পুলিশের ছোড়া প্রায় শতাধিক গুলিতে আহত হন। তবে কালু ছোট থেকেই বিএনপি দলকে ভালো বাসতেন। আওয়ামী লীগের আমলে কালু হামলা-মামলা এবং জেলও খেটেছেন।
তিনি আরো বলেন, জুলাই’র অভ্যুত্থানের ছাত্র-জনতার আন্দোলনেও অংশ গ্রহন করে পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পরেও কেন যে কালু জুলাই সনদ থেকে বঞ্চিত হয়েছে তার আমি বুঝতে পাড়ছিনা।
২৯ নং ওয়ার্ডের স্থানীয় বাসিন্দা শামিম হাওলাদার, ইউসুফ হাওলাদার সহ একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, জুলাই আন্দোলনে সুরুজ শিকদার কালুর ব্যাপক ভূমিকা ছিলো আন্দোলনে। শুধু তাই নয় পুলিশের গুলিতে কালু আহত হওয়ার ঘটনার দিন পুলিশ কালুর বাড়ি এসে ধরে নেওয়ার জন্য তাকে খুঁজতে ছিলেন। পরে তাকে ঘরে না পেয়ে এলাকার বিভিন্ন ঘর-বাড়ি তল্লাসি চালিয়ে না পেয়ে চলে যায়।
স্থানীরা আরো বলেন, বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের প্রশ্ন জুলাই আন্দোলনে পুলিশের ছোড়া গুলিতে আহত এবং নির্যাতনের শিকার হয়েও কেন জুলাই সনদের তালিকায় কালুর নাম নেই। আমাদের স্থানীয়দের একটাই দাবি জুলাই সনদে কালুর নাম তালিকাভূক্ত করা হোক।
জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ আহত কালুর স্ত্রী বলেন, আমার স্বামীকে গতবছর ২০২৪ সালে ১৫ জুলাই সাবেক সরকার পতনের আন্দোলনে যখন যায় তখন আমি তাকে বার বার মানা করেছিলাম তুমি কোন আন্দোলনে বা কোন ঝামেলায় ভিতরে যাইও না। কিন্তু তিনি তা শুনেন নি। তিনি প্রতিদিনই তার লোকজন নিয়ে জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশ নেন।
১৭ জুলাই দুপুরে বাসার পাশ্বের এক লোক এসে বলেন ভাবি কালু ভাই তো পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে রাস্তায় পরে আছে। পরে আমরা গিয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করি। তার কিছুক্ষন পরেই হাসপাতালে পুলিশ আসে কালুকে গ্রেফতার করার জন্য। পরে তাকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে এসে বাহিরে চিকিৎসা করাই। জুলাই আন্দোলনে কালু গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর এখনও অসুস্থ। তার পরেও তিনি জুলাই’র যোদ্ধা হিসেবে পায়নি কোন স্বকৃতি।
কালুর স্ত্রী আরো বলেন, আহত হওয়ার পরে অনেকেই সাহায্য সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও পরে কেউ কোন খোঁজ খবর নেয়নি। এবং কিং জুলাই বিপ্লবে আহতদের তালিকাভুক্ত করার জন্য কয়েকদফা চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন আমরা।
গুলিবিদ্ধ কালুর শরীরের ভিতরে থাকা বুলেট অপারেশনের মাধ্যমে বের করা চিকিৎসক বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের সার্জারী বিভাগের সহকারী রেজিষ্ট্রার ডাঃ খালিদ মাহমুদ এর সাথে প্রতিবেদকের কথা হলে তিনি বলেন, কালু নামে এক ব্যক্তি জুলাই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে চিকিৎসার জন্য আমার কাছে আসেন। এবং এখনও তিনি আমার অধিনে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে। শুধু তাই নয় তার শরীল থেকে প্রচুর বুলেট বের করা হয়েছে। তবে কালু এখনও জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কারন হচ্ছে তার গলার ভিতরে এবং মাথার ভিতরে যে গুলি রয়েছে তা খুবই কিটিক্যাল। কালুর বর্তমানে উন্নত চিকিৎসা দরকার বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। তবে কালু কবে নাগাদ পুরোপুরি সুস্থ হবেন তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া গুলিবিদ্ধ কালুর বিষয় নিয়ে বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুকের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, যারা জুলাই আন্দোলন সংগ্রামে আহত হয়েছে, মৃত্যুর হাত থেকে বেচে এসেছে দেখা গেছে জুলাইয়ের সনদের তালিকায় তাদের নাম নেই।
অথচ জুলাই আন্দোলনে পুলিশের ছোড়া প্রচুর গুলিতে বিএনপির নেতা কালু আহত হয়েছে। কিন্তু তালিকায় তার নাম নেই। তাই আমাদের দাবি প্রকৃত যারা জুলাই-আগস্টরের যোদ্ধা তারা যেন তাদের সম্মান এবং জুলাই সনদ পায়।
বরিশাল জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়ে আহত হওয়া বরিশাল জেলায় প্রথম ধাপে ৩০ জন শহিদ পরিবারের সদস্যর পাশাপাশি ৩৮৯ জন জুলাই যোদ্ধাকে সংবর্ধনা প্রদান করেছি। কিন্তু জুলাই’র যোদ্ধার তালিকায় কিছু নাম বাদ পড়ার কারনে দ্বিতীয় ধাপে ৬০ জনের তালিকা মন্ত্রাণলয়ে পাঠানো হয়েছে। তার পরেও যদি প্রকৃত কোন জুলাই যোদ্ধার নাম বাদ যায় তাহলে মন্ত্রাণলয়ের পরবর্তী সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাকে তালিকাভুক্ত করা যাচ্ছে না।
তিনি আরো বলেন, গুলিবৃদ্ধ আহত বিএনপির নেতা কালু জুলাই যোদ্ধাদের তালিকার কারার কার্যক্রমের সময় পাড় হওয়ার পরে আবেদন করেছে। তাই অনলাইনে তথ্য ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) না আসার কারনে তালিকাভুক্ত হয়নি তিনি। তবে আমরা তার আবেদনটি মন্ত্রাণলয়ে পাঠিয়েছি। আশা করি মন্ত্রাণলয় কোন একটা ব্যবস্থা করবে।
জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যাক্তিদের সবার নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে তাদের যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করার হোক এমনটাই জানিয়েছেন বরিশালের সতেচন মহল।