ভোলা
লালমোহনে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, জনমনে আতঙ্ক
ভোলার লালমোহন উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি চুরি, ইভটিজিং, মাদক বিক্রি ও অবৈধ দখলের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। পৌরসভাসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দারা জানান, দিনে-দুপুরেও এখন আর নিরাপদ বোধ করা যাচ্ছে না।
স্থানীয় সূত্র জানা যায়, গত মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) দিবাগত রাতে পশ্চিম চর উমেদ ইউনিয়নের চরকচুয়াখালী এলাকায় মো. আবু বক্কর (৫৫) নামে এক অটোরিকশা চালককে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা অটোরিকশা ছিনতাই করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় পুলিশের এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড দালাল বাজার এলাকায় দিনে দুপুরে একটি অটোরিকশা চুরি হয়। যদিও পরবর্তীতে বোরহানউদ্দিন থানা পুলিশ ঐ অটোরিকশাসহ চোরকে আটক করেন । এছাড়া কালমা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড লেজ ছকিনা গ্রামে পৃথক দুটি অটোরিকশা চুরির ঘটনাও ঘটে। চরভুতা ইউনিয়নের বাংলাবাজারে ৩ জানুয়ারি ভোর রাতে কীটনাশকের সার্টারের তালা ভেঙ্গে দোকানের ক্যাশ থেকে নগদ ২ লাখ টাকা ও ৩ লাখ টাকার কীটনাশক নিয়ে যায় চোরচক্র।
গত কয়েক সপ্তাহে একাধিক বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটেছে। ২৬ ডিসেম্বর বদরপুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড হাজিরহাট এলাকায় রহমান সিউলির বাড়িতে খাবারে নেশাজাতীয় দ্রব্য মিশিয়ে ১০ ভরি স্বর্ণ ও নগদ দেড় লাখ টাকা লুট করা হয়। পরদিন একই এলাকার জমাদার বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার সুপারি চুরি হয়। ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড কামাল হাওলাদারের ঘরে নেশাজাতীয় স্প্রে ব্যবহার করে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার লুট করা হয়। একই তারিখে ২নং ওয়ার্ডে প্রতিবন্ধী জাকিরের একটি ছাগল চুরি হয় এবং ৯নং ওয়ার্ডে তৈয়ব মাওলানার নয় বস্তা সিদ্ধ ধান চুরি এছাড়া ৯নং ওয়ার্ডে হেলার মাঝির নৌকা থেকে সোলার ব্যাটারি চুরি । ২৯ ডিসেম্বর ওই ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড পুলিশ ক্যাম্পের পাশে মোসলেহ উদ্দিন মিয়ার বাড়ি থেকে নগদ ৫০ হাজার টাকা ও স্বর্ণালংকার চুরি হয়।
অন্যদিকে শুক্রবার (২ জানুয়ারী) দিবাগত রাতে রমাগঞ্জ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব চর উমেদ গ্রামের আজাহার রোড এলাকার আফির উদ্দিন বাড়ীর মৃত বাবুলের বসত ঘরে, ওমর আলী হাজী বাড়ীর মাকসুদ উল্লাহ মিয়ার ঘরে প্রবেশ করে তার ছেলে সেকান্তর ও তার স্ত্রীর নগদ টাকা, স্বর্নের চেইন, একই বাড়ীর মিজান খলিফা, বিডিপি প্রার্থী নিজামুল হক নাঈম এবং জামায়াতের উপজেলা আমির মাওলানা আব্দুল হকের গ্রামের বাড়ির বসতঘরে সিঁধেল কেটে হানা দেয় চোরের দল।
এছাড়া লালমোহন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বেড়েছে। লালমোহন পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের করিম রোড, থানার মোড় ও আশপাশ এবং লালমোহন করিমুন্নেছা–হাফিজ মহিলা কলেজের সামনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলাকালীন সময়েও ইভটিজিংয়ের অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্কুলছাত্রী বলেন, সকালে বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের যাওয়ার সময় করিম রোডের সামনে ঠিক থানার অপজিটে কিশোর গ্যাংয়ের একটি দল মেয়েদের উত্যক্ত করেন, সেদিন আমার আম্মুকেও ওরা উত্যক্ত করা থেকে বিরত থাকেনি।
এছাড়া ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের সিন্নিখোলা, বাতিরখাল এলাকা, আজহাররোড ও চতলা বাজার সড়কের মধ্যবর্তী কালভার্টে প্রকাশ্যে গাঁজা বিক্রি ও সেবনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পৌরসভার সাবেক পল্লীবিদ্যুৎ অফিস সড়ক, মডেল সমজিদসংলগ্ন পৌরসভার গেট এলাকায়, ভুইল্লালাগো কান্দি, নয়ানীগ্রাম, আড়াই আনি সড়ক, লেংগার দোকান, বর্নালী সড়ক, গুচ্ছ গ্রাম, হাইস্কুল মাঠ, কল্লাকাটা রোড, পাটওয়ারী কান্দি, পৌরসভার গোল মার্কেটের ছাদের ওপর, পলিটেকনিক্যাল কলেজের পিছনের রোড়, জেলেপাড়া, পাকার মাথাসহ বিভিন্ন স্পটে মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগ রয়েছে। একই চিত্র দেখা মেলে কালমা ইউনিয়নের তরুল্যা সেন্টার ও ডাওরী বাজারের দক্ষিণ পূর্ব পাশে চরলক্ষী এলাকায়, চরছকিনা, আলম বাজার, ফরাজির দোকান, মেম্বারের দোকান এলাকায় মাদক বেচাকেনা চলছে অহরহ। লালমোহন ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড উত্তর ফুলবাগিচা এলাকায় গুচ্চগ্রামে মাদক প্যাকেটজাত, সেবন ও বিক্রি হচ্ছে নিয়মিত।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, লালমোহন থানার সোর্স যারা রয়েছেন তাদের মাধ্যমে লালমোহনের দায়িত্বরত এসআই ও এএসআইদের একটি চক্র এই মাদক ব্যবসার সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, থানায় সাধারণ ডায়েরি বা অভিযোগ করতে গেলে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা দিতে হয়। তদন্ত কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গেলে আলাদাভাবে বাদী ও বিবাধেী থেকে ২-৪ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি সন্ধ্যার পর থানার ভেতর ও আশপাশে সালিশ বাণিজ্য চলার কথাও উঠে এসেছে।
স্থানীয় এক সমাজ কর্মী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জানান, লালমোহন থানায় গেলে দেখবেন এসআই ও এএসআইদের নেতৃত্বে থানার গোল ঘরে সন্ধ্যায় পর থেকে চলে রমরমা সালিশ বাণিজ্য, তারা নারী ও শিশু ডেস্কটিও সালিশ বাণিজ্যে ব্যবহার করেন। থানায় এই সালিশ বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রয়েছে এক শ্রেণির দালাল সার্ভেয়ার। এদের মধ্যে রয়েছে যুবলীগ নেতা সার্ভেয়ার কবির, শরিফসহ কয়েকজন। তিনি আরও জানান, থানায় একটি জিডি বা অভিযোগ লিখতে হলে দিতে হয় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা।
সূত্র জানায়, পূর্বের ওসি সিরাজুল ইসলাম এই সালিশ বাণিজ্যে রুখে দিয়েছিলেন। তিনি থানা থেকে সালিশের টুলটেবিল গুলো অপসারণ করেছিল।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে নিয়মিত টহল, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং মাদক ও ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সমাজে চরম বিশৃঙ্খলতা দেখা দিবে।
আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, চুরি, মাদক ও থানায় সালিশ বাণিজ্য এবং ইভটিজিং সংক্রান্ত বিষয়ে লালমোহন থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. অলিউল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলার অবনির মতো কোন ধরনের ঘটনা ঘটেনি। বর্তমানে প্রচন্ড শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে চুরির ঘটনা বেড়েছে। ভুক্তভোগীর অভিযোগের আলোকে ব্যবস্থা নেয়া হবে। অটো রিকশা চালককে হত্যার ঘটনাটি উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। থানার মধ্যে সালিশ বাণিজ্যের বিষয়টি আমার জানা নেই। থানায় অভিযোগ বা জিডি এবং ঘটনার তদন্ত করতে টাকা নেওয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে বলেন, ভুক্তোভোগী অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। দু:খের বিষয় হলো অধিকাংশ ঘটনার ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ করতে অনিহা প্রকাশ করেন। আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কিত যে কোন ব্যাপারে থানায় অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাদকের ব্যাপারে থানা পুলিশ জিরো টলারেন্স হিসেবে কাজ করছি, তবে কাজের গতিটা আরও বাড়ানো দরকার।’


