জাতীয়
এখন থেকে ‘বলাৎকারও’ ধর্ষণ
নিজস্ব প্রতিবেদক : নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করা হয়েছে। এই অধ্যাদেশে আগের আইনের ২৬টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে।গতকাল মঙ্গলবার রাতে জারি করা এ অধ্যাদেশে ধর্ষণের সংজ্ঞায় পরির্বতন এনে নারী ও শিশুর পাশাপাশি কোনো ছেলে শিশুকে ‘বলাৎকার’ (অর্থ কোনো ছেলে শিশুর মুখ বা পায়ুপথে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক সংঘটিত যৌনকর্ম)-কে ধর্ষণের অপরাধ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি অধ্যাদেশে বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম করার বিষয়টি নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এক্ষেত্রে আগের আইনের ৯ ধরার সঙ্গে ৯(খ) নামে নতুন একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এ ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি দৈহিক বলপ্রয়োগ ব্যতীত বিবাহের প্রলোভন দেখাইয়া ষোলো বছরের অধিক বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে যৌনকর্ম করেন এবং যদি উক্ত ঘটনার সময় উক্ত ব্যক্তির সহিত উক্ত নারীর আস্থাভাজন সম্পর্ক থাকে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক সাত বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।’
এর আগে আইনে ছেলে শিশুদের ধর্ষণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কিন্তু প্রায়ই এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। ফলে এসব অপরাধের বিচার করা কষ্টকর ছিল। এখন থেকে এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী বলাৎকারের ঘটনাও ধর্ষণ হিসেবে বিচার করা যাবে। এ ছাড়া অধ্যাদেশে আইনের ৪(১) ধারার পরিবর্তন এনে অর্থদণ্ড এক লাখ টাকার পরিবর্তে ২০ লাখ টাকা করা হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশে নতুন করে মিথ্যা মামলা করলে তা আমলে নেওয়ার এখতিয়ার ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া হয়েছে। এর আগে মিথ্যা মামলা করলে বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল তা বিচারে ব্যবস্থা নিতে পারতেন। এক্ষেত্রে আইনের ১৭ ধারায় সংশোধন করে ১৭(৩) নামে একটি নতুন উপধারা যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে অধ্যাদেশে।
এতে বলা হয়েছে, ‘(৩) উপ-ধারা (১) ও (২)-এ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের অধীন কোনো অপরাধের বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর রায় প্রদানকালে যদি ট্রাইব্যুনালের নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রমাণিত হয় যে, কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক, তাহা হইলে উক্ত ট্রাইব্যুনাল মামলা বা অভিযোগ দায়েরকারী ব্যক্তিকে কারণ দর্শানোর সুযোগ প্রদানপূর্বক সংশ্লিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তি বা অভিযুক্ত ব্যক্তিগণ বরাবর যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ দিতে পারিবে এবং প্রয়োজন মনে করিলে ক্ষতিপূরণের আদেশ প্রদানের পাশাপাশি উক্ত মামলা বা অভিযোগ দায়েরকারী ব্যক্তিকে অনধিক দুই বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করিবার আদেশ প্রদান করিতে পারিবে।’
নতুন এই অধ্যাদেশে ধর্ষণের তদন্ত ৬০ কার্যদিবসের স্থলে ৩০ কার্যদিবস এবং এ সময়ের মধ্যেও তদন্ত সম্পন্ন না হলে অতিরিক্ত ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করার বিধান করা হয়েছে। আইনের ১৮ (১) (ক) ধরায় বলা আছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ করার সময় হাতেনাতে ধরা পড়লে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে। আর ১৮(১)(খ) ধারায় বলা আছে, হাতেনাতে ধরা না পড়লে তদন্ত ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করতে হবে। এ জায়গায় পরিবর্তন করে অধ্যাদেশে ৩০ কার্যদিবস করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১৮(২) ধারায় পরিবর্তন করে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ‘কোনো যুক্তিসংগত কারণে উপ-ধারা (১)-এ উল্লিখিত সময়ের মধ্যে তদন্তকার্য সমাপ্ত করা সম্ভব না হইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তের মেয়াদ শেষ হইবার পূর্বে কেস ডায়েরিসহ বিলম্বের কারণ সংবলিত লিখিত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে বা, ক্ষেত্রমত, ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট উপস্থাপন করিবেন এবং ট্রাইব্যুনাল বা ম্যাজিস্ট্রেট সন্তুষ্ট হইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করিবেন।
তবে শর্ত থাকে যে, যেসব মামলার তদন্তে ট্রাইব্যুনাল বা, ক্ষেত্রমত, ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন সাপেক্ষে ডিএনএ পরীক্ষা আবশ্যক, সেসব মামলার তদন্তের মেয়াদ ট্রাইব্যুনাল বা, ক্ষেত্রমত, ম্যাজিস্ট্রেট ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সময় পর্যন্ত বর্ধিত করিতে পারিবে।’
আইনের ১৮ ধারায় নতুন ১০ উপধারা যুক্ত করে বলা হয়েছে, ধর্ষণের মামলা তদন্ত করার সময়ে প্রশাসনিক আদেশে কোনো তদন্তকারী কর্মকর্তার বদলি কার্যকর করা যাবে না। এ ছাড়া আইনের ২০(৩) ধারা সংশোধন করে ধর্ষণের বিচার মামলা প্রাপ্তির ১৮০ দিনের পরিবর্তে অভিযোগ গঠনের তারিখ থেকে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে করার বিধান করা হয়েছে।
অধ্যাদেশে ২৬(ক) নামে নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। নতুন এ ধারায় শিশু ধর্ষণ অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। আইনের ২৬(১) ধারায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের কথা বলা আছে।
আর ২৬(ক)(১) ধারায় বলা হয়েছে , ‘২৬-এর উপ-ধারা (১)-এর বিধান সত্ত্বেও সরকার এই আইনের অধীন শিশু ধর্ষণ সংক্রান্ত অপরাধ বিচারের নিমিত্ত প্রত্যেক জেলায় ও মহানগর এলাকায় এক বা একাধিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করিতে পারিবে এবং এইরূপ ট্রাইব্যুনাল শিশু ধর্ষণ অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল নামে অভিহিত হইবে।’
২৬(ক)(২) ধরায় বলা হয়েছে, ‘একজন বিচারক সমন্বয়ে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হইবে এবং সরকার জেলা ও দায়রা জজগণের মধ্য হইতে উক্ত ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিযুক্ত করিবে।’ এ ছাড়া আইনে নতুন ৩৫ ধারা যুক্ত করে যৌতুকের মামলাগুলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বাইরে বিচারের বিধান করা হয়েছে।
নতুন এ ধারায় বলা হয়েছে, ‘ধারা ১১ এর দফা (গ)-এ বর্ণিত অপরাধ সম্পর্কে বিশেষ বিধান। (১) এই আইনে যাহা কিছু থাকুক না কেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ বলবৎ হওয়ার তারিখ হইতে ধারা ১১-এর দফা (গ)-এ বর্ণিত অপরাধ (যৌতুকের জন্য নির্যাতন ও জখম) প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিচারার্থ গ্রহণীয় ও বিচারযোগ্য হইবে।
তবে শর্ত থাকে যে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ বলবৎ হওয়ার পূর্বে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধারা ১১-এর দফা (গ)-এর অধীন দায়ের অনিষ্পন্ন মামলাগুলো এখতিয়ারসম্পন্ন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বদলি হইবে না এবং উক্ত অধ্যাদেশ বলবৎ হইবার পূর্বে এই আইনের অধীন অনিষ্পন্ন মামলাসমূহ তদন্তকারী কর্মকর্তা, এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত, ট্রাইব্যুনাল এবং আপিল-সংশ্লিষ্ট আদালতে এমনভাবে পরিচালিত ও নিষ্পত্তি হইবে যেন উক্ত অধ্যাদেশ বলবৎ হয় নাই।’
৩৫-এর (২) উপধারায় বলা হয়েছে, ‘ধারা ১১-এর দফা (গ)-এ বর্ণিত অপরাধ বিচারার্থ গ্রহণীয় (Cognizable), আপসযোগ্য ও জামিন-অযোগ্য হইবে এবং উক্ত অপরাধের অভিযোগ দায়ের, তদন্ত, বিচার, আপিল ও নিষ্পত্তিসহ পদ্ধতিগত সব ক্ষেত্রে এই আইনের অন্যান্য ধারার বিশেষ বিধানাবলির পরিবর্তে ফৌজদারি কার্যবিধি ও Evidence Act, 1872 (Act I of 1872)-এর বিধানাবলি প্রযোজ্য হইবে।
এ ছাড়া ৩৫ ধারার (৩) উপধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি ট্রাইব্যুনালে বিচার্য কোনো অপরাধের সহিত ধারা ১১-এর দফা (গ)-এ বর্ণিত অপরাধ এমনভাবে জড়িত থাকে যে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে উভয় অপরাধের বিচার একই সঙ্গে বা একই মামলায় করা প্রয়োজন, তাহা হইলে উক্ত ধারা ১১-এর দফা (গ)-এ বর্ণিত অপরাধটির বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার্য অপরাধের সহিত এই আইনের বিধান অনুসরণে একই সঙ্গে বা একই ট্রাইব্যুনালে করা যাইবে।’